
কালীগঞ্জে ছেলের পরীক্ষায় নাম্বার কম দেওয়ায় শিক্ষিকাকে নির্যাতন !
মোঃ আল-আমিন দেওয়ান, কালীগঞ্জ, গাজীপুর :
গাজীপুরের কালীগঞ্জে রাথুরা ১নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার ভূল উত্তরে নাম্বার না দেওয়ায় সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানাকে শারিরীক ভাবে লাঞ্চনা করেছেন একই বিদ্যালয়ের জুনিয়র সহকারী শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ। ছেলেকে বেসরকারী কিন্ডার গার্টেনে ভর্তি রেখে সরকারী বই ও উপবৃত্তির টাকা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে সহকারী শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখের বিরুদ্ধে। সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের রাথুরা ১নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী জুনিয়র শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ ২০২৩ সনে অত্র বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তার ছেলে আহনাফ শেখ তার পরিচালনাধীন বড়গাও মডেল কিন্ডার গার্টেনে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হয়ে লেখাপড়া করেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার ছেলেকে রাথুরা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজিরা খাতায় নাম লিখে বিদ্যালয় হতে সরকারী বই ও উপবৃত্তি সহ সরকারী সকল সুবিধা ভোগ করেন। একই বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানার ছেলে আহসান জারিফ দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। সম্প্রতি তাদের প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। মো. ওমর ফারুক শেখের ছেলে ইংরেজী বিষয়ের পরীক্ষায় একটি প্রশ্নের উত্তর সঠিক না দেওয়ায় শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা তাতে কোন নাম্বার প্রদান করেননি। ফারুক শেখ তাতে ক্ষীপ্ত হয়ে সিনিয়র শিক্ষক রাজিয়া সুলতানার সাথে খারাপ আচরণ করে তাকে নানা ধরণের হুমকি প্রদান করেন এবং এ প্রশ্নের উত্তর সঠিক হিসেবে গ্রহণ করে তার ছেলে আরও চার নাম্বার বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। রাজিয়া সুলতানা তাতে অপারগতা প্রকাশ করায় জুনিয়র শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ তার সাথে তর্কে জড়ায় এক পর্যায়ে সিনিয়র শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানাকে শারিরীক ভাবে লাঞ্চিত করেন। মো. ওমর ফারুক শেখ পরবর্তীতে শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানাকে লাঞ্চিত করার ঘটনাটি স্থাণীয় লোকজনের কাছে ভিন্নভাবে প্রচার করে নিজের ক্ষমতার বিষয় জাহির করতে থাকেন এবং শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা ও তার ছেলে আহসান জারিফকে দেখে নেওয়ার হুমকি প্রদান করেন। দুইদিন পর বিষয়টি যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে ওমর ফারুক শেখ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাধিকা চন্দ্র দেবনাথকে ম্যানেজ করে তার মাধ্যমে বল প্রয়োগ করে বিষয়টি ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। স্থাণীয় সাংবাদিকগণ অভিযুক্ত শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাধিকা চন্দ্র দেবনাথের নিকট বিষয়টি জানতে চাইলে প্রথমে তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাজিয়া সুলতানা ও ফারুক মাষ্টারের সাথে কোন ধরণের ঘটনা ঘটেনি বলে জানান। পরে স্থাণীয় সাংবাদিকগণ ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিদ্যালয়ে গিয়ে লাঞ্চনার শিকার শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা, অভিযুক্ত শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাধিকা চন্দ্র দেবনাথের সাথে কথা বলেন। ঐ সময় তারা রাজিয়া সুলতানাকে লাঞ্চনার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন এবং বলেন আমরা তার সমাধান করে ফেলেছি। প্রতিবেশী মরহুম মো. সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী মোসা. আসমা বেগম অভিযোগ করে বলেন, রাথুরা গ্রামের মো. আব্দুল আউয়ালের ছেলে মো. ওমর ফারুক শেখ ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুবাধে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। মো. ওমর ফারুক মাষ্টার তার ভাইদের নিয়ে আমার স্বামীর মালিকানাধীন জমি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্থাণীয় সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বিভিন্ন ভাবে হয়রানী করে আসছেন। এ বিষয়ে রাথুরা ১নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা বলেন, বিদ্যালয়ের জুনিয়র শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখের ছেলে আমাদের বিদ্যালয়ে প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ইংরেজী বিষয়ের পরীক্ষায় একটি প্রশ্নের উত্তর ভূল দিয়েছে। আমি তার খাতা দেখা সময় ভূল উত্তরে নাম্বার না দেওয়ায় সহকর্মী ফারুক স্যার আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন এবং তাতে নাম্বার দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আমি অপারগতা প্রকাশ করায় আমার সাথে তর্কে জড়িয়ে পরেন। আমি ক্লাসে যাওয়ার জন্য চেয়ার থেকে উঠতে চাইলে ফারুক স্যার আমাকে শারিরীক ভাবে লাঞ্চনা করেন। আমি কৌশল অবলম্বন করে বড় ধরনের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাই। পরবর্তীতে ফারুক স্যার নিজেই এলাকায় বিভিন্ন লোকজনের নিকট আমাকে হেয় করার উদ্দেশ্যে শারিরীক ভাবে লাঞ্চনার ঘটনা বলে বেড়ায়। এ বিষয়ে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য আমাকে ও আমার স্বামীকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরণের হুমকি দিয়ে আসছেন। অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ বলেন, আমি ২০২৩ সনে অত্র বিদ্যালয়ে যোগদান করেছি। আমার ছেলে বড়গাঁও মডেল কিন্ডার গার্টেনে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। সে এই বিদ্যালয় হতে সরকারী বই নিয়েছে এবং নিয়মিত উপবৃত্তির টাকা পায়। গত প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। বিদ্যালয়ের ইংরেজী বিষয়ের শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা পরীক্ষার খাতা দেখার সময় একটি প্রশ্নের উত্তরে নাম্বার না দেওয়ায় তার সাথে কথা কাটাকাটি হয়। ঐ সময় আমি উত্তেজিত হয়ে গেলে আমাদের মাঝে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। আমরা তার সমাধান করে ফেলেছি। সংশ্লিষ্ট ক্লাষ্টারের সহকারী শিক্ষা অফিসার গোলাম রহমান বলেন, উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের রাথুরা ১নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জুনিয়র সহকারী শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ কর্তৃক সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা শারিরীক লাঞ্চনার বিষয়টি শুনে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে কথা বলেছি। উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম কামরুল ইসলাম বলেন, রাথুরা ১নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জুনিয়র সহকারী শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ একই বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকাকে শারিরীক লাঞ্চনার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ঘটনা তদন্ত পূর্বক দোষী শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরকারী চাকরী নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।