
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ,বয়স গোপনে শিক্ষক মোঃ আঃ খালেকের একাধিক জন্মসাল!
বিশেষ প্রতিনিধি:
ঝালকাঠীর রাজাপুর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোঃ আঃ খালেকের বিরুদ্ধে বয়স ও শিক্ষাগত তথ্য গোপন করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ এবং দীর্ঘদিন সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যম অনুসন্ধান শুরু করলে বিভিন্ন শিক্ষাগত সনদ, পারিবারিক তথ্য, উত্তরাধিকার সনদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র সংশ্লিষ্ট নথিতে একাধিক অসঙ্গতির তথ্য সামনে আসে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোরের এসএসসি পরীক্ষার একটি সনদে দেখা যায়, মোঃ আঃ খালেক তালুকদার, পিতা মোঃ আঃ হক তালুকদার, সোনারগাঁও জে.এ.কে. উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৮ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় বাণিজ্য শাখায় তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ওই সনদে তার জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে ১ জানুয়ারি ১৯৬২। সনদে নিবন্ধন নম্বর ১৩৫৭৬/১৯৭৪-৭৫ এবং ক্রমিক নম্বর ডি-১৬৪৮৭৮ উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষার নথি অনুযায়ী, গালুয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ১৯৮৮ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মোঃ আঃ খালেক, পিতা মোঃ আঃ হক তালুকদার, রোল নম্বর ৩৬৪৮৯, দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ওই আবেদনপত্রে তার জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে ১ জানুয়ারি ১৯৭২। দাখিল নিবন্ধন নম্বর ৩৩৭৮৪ এবং শিক্ষাবর্ষ ১৯৮৬-১৯৮৭। একই নাম, একই পিতার নাম এবং একই ঠিকানা থাকা সত্ত্বেও দুইটি শিক্ষাগত নথিতে জন্মসালের মধ্যে ১০ বছরের ব্যবধান পাওয়া গেছে। একটি সনদে জন্মসাল ১৯৬২ এবং অন্যটিতে ১৯৭২ উল্লেখ থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ০৪ নং গালুয়া ইউনিয়ন পরিষদ, রাজাপুর, ঝালকাঠি কর্তৃক ইস্যুকৃত ওয়ারিশ/উত্তরাধিকার সনদ নং-১৩৯৩, ইস্যু তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২৬ অনুযায়ী মৃত আছিয়া বেগমের উত্তরাধিকার হিসেবে ছয় সন্তানের নাম উল্লেখ রয়েছে। সেখানে প্রথম পুত্র হিসেবে মোঃ আঃ খালেক, দ্বিতীয় পুত্র মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিক এবং তৃতীয় পুত্র মোঃ আব্দুল মুত্তালিবের নাম রয়েছে। পরিবারের দ্বিতীয় পুত্র মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিকের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্মসাল ১৯৬৮। অন্যদিকে তৃতীয় পুত্র মোঃ আব্দুল মুত্তালিবের বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষার নথি অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৫ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং তার জন্মতারিখ ১ মার্চ ১৯৭০ উল্লেখ রয়েছে। এদিকে অনুসন্ধানে আরও পাওয়া যায়, মোঃ আঃ খালেকের প্রথম সন্তান মোঃ রিয়াজ তালুকদার পঞ্চগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তার শিক্ষাগত সনদে জন্মতারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪ উল্লেখ রয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি মোঃ আঃ খালেকের সরকারি চাকরিতে ব্যবহৃত জন্মতারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৭২ হয়ে থাকে, তাহলে ১৯৮৪ সালে তার সন্তানের জন্মের বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? সে ক্ষেত্রে সন্তানের জন্মের সময় পিতার বয়স দাঁড়ায় প্রায় ১২ বছর ৯ মাস, যা স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, চাকরিতে প্রবেশের উদ্দেশ্যে পরবর্তীকালে নতুন শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে বয়স কম দেখানো হয়েছে এবং পরে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এইচএসসি বা সমমানের সনদ সংগ্রহ করা হয়। এসব নথির ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে যোগদান এবং পরবর্তীতে জাতীয়করণের সুবিধা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। স্থানীয় কাজী অফিসে সংরক্ষিত বিবাহ (নিকাহ) নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, মোঃ আব্দুল খালেক ২৭ মার্চ ১৯৭৯ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নিকাহ রেজিস্টারে বরের বয়স ২২ বছর এবং কনের বয়স ১৮ বছর উল্লেখ রয়েছে।ওই তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয়দের একাংশের দাবি, নিকাহ রেজিস্টারে উল্লেখিত বয়স সঠিক হলে মোঃ আঃ খালেকের সম্ভাব্য জন্মসাল ১৯৫৭ সালের কাছাকাছি হওয়ার কথা। অথচ বিভিন্ন নথিতে তার জন্মসাল কখনও ১৯৫৭, কখনও ১৯৬২ এবং কখনও ১৯৭২ হিসেবে উল্লেখ থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই ব্যক্তির নামে একাধিক জন্মসালের তথ্য পাওয়ায় প্রকৃত জন্মতারিখ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারি ও শিক্ষাগত নথিতে ভিন্ন ভিন্ন জন্মতারিখ ব্যবহার করে প্রকৃত বয়স গোপন করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করেনি।এলাকাবাসী ও অভিযোগকারীরা বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সব শিক্ষাগত সনদ, জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, সার্ভিস বুক, নিকাহ রেজিস্টারসহ অন্যান্য সরকারি নথি পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রয়োজনে আইনগত বিধান অনুযায়ী উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ মতামত ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত বয়স নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি। অভিযোগের বিষয়ে মোঃ আঃ খালেকের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়েছে। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।