
পরিবেশ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় আমাদের করণীয় !
মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতি আমাদের জীবন, জীবিকা ও সভ্যতার ভিত্তি। নির্মল বাতাস, বিশুদ্ধ পানি, উর্বর মাটি, সবুজ বনভূমি এবং জীববৈচিত্র্য ছাড়া মানবসভ্যতার অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। কিন্তু আধুনিক উন্নয়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বন উজাড়, প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের নির্বিচার শোষণের ফলে পরিবেশ ও প্রকৃতি আজ ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে যে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল লক্ষ্যই হলো পরিবেশ সংরক্ষণে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রকৃতি রক্ষায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বর্তমানে প্লাস্টিক দূষণ, বায়ু দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্ববাসীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পরিবেশ দূষণ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর হিসেবে পরিচিত। যানবাহনের কালো ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, শিল্পকারখানার নির্গত বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার কারণে বায়ুদূষণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষিত বাতাস মানুষের শ্বাসযন্ত্র, হৃদরোগ ও বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে নদী, খাল ও জলাশয় দূষিত হয়ে পড়ছে শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক এবং গৃহস্থালি আবর্জনার কারণে। কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট করছে। বনভূমি ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। পরিবেশ দূষণের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়া দিন দিন বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পরিবেশ সুরক্ষা আজ শুধু প্রকৃতি রক্ষার বিষয় নয়, এটি মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।
পরিবেশ সংরক্ষণের দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়, প্রতিটি নাগরিকেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই, তাহলে পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আমাদের বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। একটি গাছ শুধু অক্সিজেন সরবরাহ করে না, বরং কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী বা বিশেষ দিবসে একটি করে গাছ লাগানোর সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেতে পারে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বাজারে গেলে কাপড় বা পাটের ব্যাগ ব্যবহার করা উচিত। প্লাস্টিক বোতল, কাপ ও প্যাকেটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহার করা প্রয়োজন। পানি ও বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ করতে হবে। অপ্রয়োজনে বাতি, পাখা কিংবা বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালিয়ে রাখা উচিত নয়। পানি ব্যবহারে সংযমী হওয়া এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। বর্জ্য আলাদা করে ব্যবস্থাপনা করলে পুনর্ব্যবহার সহজ হয় এবং পরিবেশের ক্ষতি কমে।
পরিবেশ সচেতনতা শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ রক্ষার শিক্ষা দিতে হবে। গাছের প্রতি ভালোবাসা, প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা এবং পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সমাজভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা যেতে পারে। মসজিদ, মন্দির, স্কুল, কলেজ ও সামাজিক সংগঠনগুলো পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সামাজিক অনুষ্ঠানেও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার, শব্দদূষণ ও খাদ্যের অপচয় কমাতে হবে। বিবাহ অনুষ্ঠান, মেলা কিংবা বিভিন্ন উৎসবে পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবেশ সচেতন নাগরিক গড়ে তোলার অন্যতম কেন্দ্র। স্কুল ও কলেজে পরিবেশ শিক্ষা আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতা এবং পরিবেশ বিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে সবুজ ক্যাম্পাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যদি ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যৎ সমাজ হবে আরও পরিবেশবান্ধব।
পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। অবৈধভাবে বন উজাড় বন্ধ করতে হবে এবং নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টি করতে হবে। শহর ও গ্রামে পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা সংরক্ষণ জরুরি। নদী দখল ও দূষণ রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা প্রয়োজন। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ালে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে।
শিল্পোন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু তা অবশ্যই পরিবেশবান্ধব হতে হবে। শিল্পকারখানাগুলোকে পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলতে হবে। বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, ধোঁয়া ও রাসায়নিক নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বৃক্ষরোপণ, জলাশয় সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। সবুজ শিল্পনীতি বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাগজের ব্যবহার কমানো সম্ভব। স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা কৃষিতে পানির অপচয় কমাতে পারে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে।
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ই-বর্জ্যের সমস্যাও বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় জীববৈচিত্র্যের ভূমিকা অপরিসীম। প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদ পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে পুরো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বন্যপ্রাণী হত্যা, বন ধ্বংস এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল বিনষ্ট বন্ধ করতে হবে। জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বের পরিবেশ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষা ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে। তরুণদের উচিত পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন গ্রহণ করা, বৃক্ষরোপণে অংশ নেওয়া, প্লাস্টিক বর্জন করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। তাদের ইতিবাচক উদ্যোগ সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
পরিবেশ ও প্রকৃতি মানবজাতির অমূল্য সম্পদ। উন্নয়নের নামে যদি আমরা প্রকৃতিকে ধ্বংস করি, তাহলে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না। সুস্থ জীবন, নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং সমৃদ্ধ পৃথিবীর জন্য পরিবেশ সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। আজ প্রয়োজন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ। গাছ লাগানো, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নদী ও বন রক্ষা করা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গ্রহণের মাধ্যমে আমরা একটি সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি।
পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষা করা আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব। আসুন, পরিবেশ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সবুজ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।