
বিপ্লব-২০২৪: বিপ্লব একটি প্রসব যন্ত্রণার মতো। একে ধারণ করতে অনেক বাঁধা বিপত্তি ও দুর্যোগ-দুর্ঘটনা ঘটে। এটি এমন এক দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া যা পুরোনো অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আঘাত হেনে তার আমূল পরিবর্তন ঘটায় । বিগত ১৬বছরের দুঃশাসনের যে শাসন ব্যবস্থাপনা তা সমূলে উৎখাত করে জুলাইয়ের বিপ্লবকে সানিতে পথে এগোতে হবে। বিপ্লবোত্তর খুবই কঠিন সময় পার করে যেমন ইরানে ১৯৭৯ সনে বিপ্লব ঘটে তিন বছর ধরে সে বিপ্লবকে প্রতিষ্ঠিত করতে অনেক ঘটনা প্রবাহ ঘটেছে ১৯৮২ সাল থেকে সে দেশ শান্ত হয় কিউবার বিপ্লব একই অবস্থা ছিল গত ১৬ বছরে দুঃশাসনের দেশের শাসন ব্যবস্থাপনা সমূলে উৎখাত করে নতুন ব্যবস্থাপনা চালু করলেই রাষ্ট্র সঠিক পথে এগোবে এরিস্টটল তাঁর বিপ্লব তত্ত্ব তিনি বলেছেন অত্যন্ত তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া যারা দুঃশাসন শিকার হয়েছেন তারা সংঘবদ্ধ হয়ে ওই দুঃশাসককে উৎখাত করা বড় ধরনের বিপ্লব হতে পারে, একইভাবে তুচ্ছ ঘটনায়ও বিপ্লব হয় এরিস্টটল তার দি পলিটিক্স গ্রন্থে উদাহরণ দেখিয়েছেন সিরাকুজ রাজ্যের এক রাজা তার সমকামিতার কারণে জনগণ কর্তৃক উৎখাত হয়েছিল ঠিক একইভাবে কোটা আন্দোলন তুচ্ছ বিষয় হতে পারে, জুলাইয়ের বিপ্লব ঘটেছে তা সেরকমই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার উৎখাত হয়ে গেছে। এখনো এ বিপ্লব চলমান যেকোনো সময় বড় ধরনের অঘটন ঘটতে পারে বা না ঘটতে পারে চলমান প্রক্রিয়ায় অনেকের চাকরি যাবে অনেক মানুষ গ্রেফতার হবে, অনেক নক্ষত্রের পতন ঘটবে।
রাষ্ট্রচিন্তার দর্শন ও রাজনীতি শিক্ষা এ দুটোর অভাব হলেই সেখানেই বিপ্লব ঘটবে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ১১ বার অভ্যুত্থান ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্রচিন্তা হয়েছে গ্রিক দর্শন রাজ্য এথেন্সে। সক্রেটিসের জ্ঞানতত্ত্ব, প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র অ্যারিস্টোটলের বিপ্লব তত্ব,আমি রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে অধ্যায়ন করেছি।
বাংলাদেশে অভ্যুত্থানসমূহ:
১. ১৯৭৫ সনে ১৫ আগষ্ট,বঙ্গবন্ধু সরকার- সামরিক বাহিনীর একা অংশ বিশেষ, রশিদ ফারুক, -সামরিক অভ্যুত্থান
২. ১৯৭৫ সনে ৩ নভেম্বর, মুস্তাক সরকার উৎখাত,-সামরিক বাহিনীর খালেদ মোশরফের নেতৃত্ব। -সামরিক অভ্যুত্থান
৩. ১৯৭৫ সালের ৭ই নম্বর খালেক মোশাররফকে উৎখাত -সিপাহী জনতা অভ্যুত্থান
৪. ১৯৮১ সন ৩০শে মে জিয়া উৎখাত মেজর মঞ্জুর এর নেতৃত্বে- সামরিক অভ্যুত্থান
৫. ১৯৮১ সনে ২ জুন সামরিক হেফাজতে পাল্টা অভ্যুত্থানে মেজর মন্জুর নিহত হয়। -সামরিক অভ্যুত্থান।
৬. ১৯৮২ সনের ২৪ মার্চ প্রেসিডেন্ট সাত্তার উৎখাত, সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান এরশাদ এর নেতৃত্বে। -সামরিক অভ্যুত্থান।
৭. ১৯৯০ এর ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকার পতন। -গণঅভ্যুত্থান মাধ্যমে
৮. ১৯৯৬ ১৫ ফেব্রুয়ারী একতরফা নিবাচনে জিতে এসে সর্বদলীয় দাবির প্রেক্ষিতে তত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ করে পদ ত্যাগ করে, গণঅভ্যুত্থান
৯. ২০০৬ ১/১১ সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ইয়াজউদ্দিন ফখরুদ দীন সরকার গঠন।
১০. সামরিক ও সিভিলিয়ান অভ্যুত্থান
১১. ২০২৪সনে ৫ আগস্ট, হাসিনা সরকারের পতন -ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান।
কোন পথে দেশ: স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে এই বাংলাদেশে অনেকগুলো অভ্যুত্থান হয়েছে। যদি দলীয় ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে এমন পরিস্থিতির শিকার হতো না এদেশের জনগণ। আমেরিকায় দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা আছে: ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিক। ব্রিটেনেও রয়েছে দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা: লেবার পার্টি ও কনজারভেটিব পার্টি। একইভাবে আমাদের দেশেও ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত দুটি দলীয় ব্যবস্থাপনা ছিল: আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর নিজের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে এই দলীয় ব্যবস্থাপনাকে ধ্বংস করে এবং নিজের দলকেও ধ্বংস করে দেয়। বর্তমানে আওয়ামী লীগ গণহত্যাকারীর দল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাই বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে বিএনপি একটি বৃহৎ দল। কিন্তু সমকক্ষ কোনো দল নেই। যেমনি ছিল ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হাওয়ার পর বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা দেশ গড়ে উঠেনি। সরকার কর্তৃক বিরোধী দল দমনের মাধ্যমে দলীয় ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে দলগুলো গোপনীয় সহিংস তৎপরতা শুরু করে। দুঃশাসন-দুর্ভিক্ষের ফলে সামরিক অভ্যুত্থানে মুজিব সরকারের পতন ঘটে। দলীয় ব্যবস্থাপনা মুজিব ধ্বংস করে, সে কারণে দেশে এক ব্যক্তির শাসনের কৌশলে সামরিক শাসনে চলে আসে মেজর জিয়া ও এরশাদ। এরশাদের শাসনামলে, এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সংগঠিত হয়। পৃথক পৃথক দলীয় অবস্থায় সংগঠিত হয়। ’৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর সংসদীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে বিএনপি ১৯৯১ সালে, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে, বিএনপি ২০০১ সালে, ২০০৬ সালের ১/১১ পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ১৯৭২-৭৫ সালের বাপের দমন নীতি হাসিনা অনুসরণ করে। বিরোধী দলীয় ব্যবস্থাপনাকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে একদলীয় ব্যবস্থার উপর জোর দেয়। ২০২৪ জুলাইয়ের ছাত্রজনতার বিপ্লবের পর সেই শাসক দলের আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারের বা ফ্যাসিবাদের দল গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। গত ১৬ বছর ধরে নির্যাতিত দল বিএনপি এখন একক দলীয় শক্তিতে অর্জিত, তেমন বিরোধী শক্তি নেই বললে চলে। ছাত্রজনতার বিপ্লবের পর নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি বিপ্লবী ছাত্রদের পরামর্শে তিনি রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সংকট ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু দেশে এখনো ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয়।
জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পক্ষের শক্তিকে রুখে দিতে ফ্যাসিবাদী অপচেষ্টার বিভিন্ন দিক বুঝে পদক্ষেপ নিতে হবে। ফ্যাসিবাদীর বড় যড়যন্ত্র এর দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিভাজিত করে জাতীয় ঐক্য নষ্ট করা, এমতাবস্থায় অন্তবর্তী কালীন সরকার সংবিধান স্থগিত বা বাতিল করে সামরিক ফরমানে দেশ চালানোর পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার গ্যারান্টি থাকবে না। এর মধ্যে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানোর চেষ্টাও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। যা বিগত দিনে হয়েছে (এরশাদের শাসনামলে)।
এ পরিস্থিতিকে জটিল করতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার নানা চেষ্টাও রয়েছে। রাষ্ট্রের আর্থিক খাত অচল করে দেয়ার জন্য ক্ষমতা হারানোর আগেই ব্যাংকের ভাণ্ডার শূন্য করা হয়েছে। যার ফলে অধিকাংশ ব্যাংক গ্রাহকের চাহিদা অনুসারে টাকা দিতে পারছে না। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে অর্থনীতির গতিশীলতা থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও শিল্প এলাকায় পরিকল্পিত নাশকতা চালানো হচ্ছে। সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। জনমনে অসন্তোষ তৈরির চেষ্টায় বাজার অস্থিতিশীল করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুতে প্রচারণার মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। ভুয়া খবর এবং তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ানোর চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। এসব বিবেচনা করেই সরকার, জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।
দলগুলো পরস্পর কাদা-ছোড়াছুড়ি বন্ধ করা সমালোচনার পরিবর্তে পরামর্শে সর্বোচ্চ সহনশীলতা জরুরি।
বিপ্লবের পক্ষের সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।
ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের নানান প্রোপাগান্ডা ব্যর্থ হয়েছে।
এই বিপ্লবের উদ্যোক্তা ছিল ছাত্ররা, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠন এই বিপ্লবের অন্যতম সহায়ক হিসেবে রক্ত দিয়েছে। তবে কৃতিত্ব নিয়ে ঝগড়া না করে জাতিগত ঐক্য গড়ে তোলা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই আন্দোলনে ছাত্র, জনতা, কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, আমলা, সেনাবাহিনী সবাই ছিল। সুতরাং এ কৃতিত্ব সবার; কিন্তু যেহেতু প্রাথমিক উদ্যোগ ছাত্রদের ছিল, তাদের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
হাজার হাজার ছাত্রের আত্মত্যাগের পর খুনিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। এ ধরনের কাজ জনবিচ্ছিন্নতা ও গণ-অসন্তোষ থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় হচ্ছে আন্দোলনে সম্পৃক্ত বেসামরিক বিপ্লবী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে একটি সুসম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচারণা থেকে দূরে থাকা উচিত। এতে শত্রুরা লাভবান হবে এবং বিপ্লব-২০২৪ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা আর্থিক, কৌশলগত এবং নিরাপত্তার দিক থেকে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের সাথে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করতে ভূমিকা রাখে।
বিপ্লবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। এ ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দল, সমন্বয়কদের নিয়ে একটি দুর্নীতিবিরোধী মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। এই সেল সব প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করবে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন গঠনেও জড়িত থাকবে। সুশাসন, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়ে তারা পরামর্শ দেবেন।
বিপ্লব ও দল দু’টিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দলগুলোকে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
গণমাধ্যমগুলোর দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা ও ফ্যাসিস্ট সমর্থক গণমাধ্যমকর্মীরা যেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে না পারে সে দিকে খেয়াল রাখা। গণমাধ্যমকে অবশ্যই জাতীয় স্বার্থে কাজ করতে হবে এবং দেশের উন্নতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক:
ওচমান জাহাঙ্গীর
চবিয়ান, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, ২৮তম ব্যাচ
মানবাধিকার কর্মী, অধিকার
মোবাইল: ০১৮১৯-১৭০৩৮৪