সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৪ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
কেন বাড়ছে খুন? কক্সবাজারে  আট মাসে ৯৭ প্রানহানি, ২০ টির কারণ  অজানা! কক্সবাজারে ৬২% সরকারি  প্রাথমিক বিদ্যালয়েই নেই প্রধান শিক্ষক!  পাওনা ৬০০  টাকা চাওয়ায় মা ও তিন ছেলেকে কুপিয়ে জখম রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ যুবনেতা ই এম মেহেদী হাছান মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায়  ৩ প্রতিবাদী  যুবকের উপর হামলা সোনারগাঁয়ে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ১৪ জন গ্রেফতার খাদ্যের অপচয়রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ! বিএনপির নির্বাচনী প্রচারে হামলার মামলায় মেঘনায় আ.লীগ নেতা গ্রেপ্তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রিকশা, ভ্যান, অটো ও মিশুক চালক দলের কেন্দ্রীয় ১নং সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় চালক ও শ্রমিক নেতাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা বার্তা কিশোরগঞ্জ করিমগঞ্জে নৌকা সংঘর্ষে নিখোঁজ যুবকের মরদেহ উদ্ধার

খাদ্যের অপচয়রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ!

  • প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬



খাদ্যের অপচয়রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ!

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার।  বাংলাদেশের বাস্তবতায় একদিকে যখন অসংখ্য পরিবারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নানাভাবে অপচয় হচ্ছে। এই বৈপরীত্যকে আর নিছক সামাজিক অসচেতনতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খাদ্যের অপচয় এখন অর্থনীতি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় সমস্যা।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা WFP-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি এবং শিশুরাও অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, দুর্যোগ, অর্থনৈতিক চাপ ও মানবিক সহায়তার ঘাটতি খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় উৎপাদিত খাদ্যের একটি অংশ যদি অপরিকল্পিত সংরক্ষণ, দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা কিংবা অপ্রয়োজনীয় ভোগের কারণে নষ্ট হয়, তাহলে সেটিকে ব্যক্তিগত অপচয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় সম্পদের অপচয়।

বিশ্বের চিত্রও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি UNEP-এর Food Waste Index Report 2024 অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়েছে। ভোক্তার কাছে উপলভ্য খাদ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ গৃহস্থালি, খাদ্যসেবা ও খুচরা পর্যায়ে নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে গৃহস্থালি পর্যায়ে ৬৩ কোটি ১০ লাখ টন, খাদ্যসেবা খাতে ২৯ কোটি টন এবং খুচরা পর্যায়ে প্রায় ১২ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়েছে। এর বাইরে সরবরাহশৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপেও খাদ্য হারিয়ে যায়।

এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় আমরা কত খাদ্য উৎপাদন করি, শুধু সেই হিসাবই কি যথেষ্ট? নাকি উৎপাদিত খাদ্যের কত অংশ শেষ পর্যন্ত মানুষের খাবারের টেবিলে পৌঁছায়, সেই হিসাবও জাতীয় খাদ্যনীতির অংশ হওয়া উচিত?

খাদ্যক্ষয় ও খাদ্য অপচয়ের পার্থক্যটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে উৎপাদনের পর সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সময় খাদ্য নষ্ট হওয়া খাদ্যক্ষয়ের অংশ। আর পরিবার, দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা অনুষ্ঠানে ব্যবহারযোগ্য খাবার ফেলে দেওয়া খাদ্য অপচয়। কারণ আলাদা হলেও ফল একই। দেশের খাদ্যসম্পদ কমে যায় এবং সেই খাদ্য উৎপাদনের পেছনে ব্যবহৃত জমি, পানি, শ্রম, সার, জ্বালানি, পরিবহন ও অর্থের একটি অংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে সমস্যাটির বড় অংশ শুরু হয় কৃষকের মাঠ থেকেই। ফসল উৎপাদনের পর পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকা, পরিবহন সংকট, বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ কিংবা ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, অথচ শহরের ভোক্তা একই পণ্য বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। অর্থাৎ একই ব্যবস্থায় কৃষক হারাচ্ছেন, ভোক্তা বেশি দাম দিচ্ছেন এবং দেশের খাদ্যসম্পদ নষ্ট হচ্ছে। তাই কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য রক্ষা করাও খাদ্যনিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ।

বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান, বুফে, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন আয়োজনেও খাদ্য অপচয় দৃশ্যমান। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার প্রস্তুত করা, প্লেটে অতিরিক্ত খাবার নেওয়া এবং পরে তা ফেলে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নেওয়া এবং প্রয়োজনে দ্বিতীয়বার নেওয়া খুব সহজ একটি সমাধান। আতিথেয়তার মর্যাদা খাবারের পরিমাণে নয়, যত্নে।

 

তবে নাগরিক সচেতনতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগত জবাবদিহিও জরুরি। বড় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বড় অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় কত খাবার প্রস্তুত হচ্ছে, কতটা পরিবেশন হচ্ছে এবং কতটা অব্যবহৃত থাকছে, তার হিসাব রাখা সম্ভব। সরকারি প্রতিষ্ঠানেও খাদ্য ব্যবহারের রেকর্ড থাকা উচিত। জনগণের অর্থে কেনা খাদ্যও জনগণের সম্পদ।

এখন সবচেয়ে জরুরি হলো খাদ্য অপচয়কে পরিমাপযোগ্য জাতীয় সূচকে পরিণত করা। কারণ যে ক্ষতি আমরা পরিমাপ করি না, তা কার্যকরভাবে কমানোর পরিকল্পনাও করা যায় না। বাংলাদেশে একটি জাতীয় খাদ্য অপচয় ডাটাবেস গড়ে তোলা যেতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে প্রতিবছর কোন পর্যায়ে কত খাদ্য নষ্ট হচ্ছে এবং তার কারণ কী, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রথমে বড় শহর, পরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

এর সঙ্গে চালু করা যেতে পারে জাতীয় খাদ্য অপচয় সূচক। এতে উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, খুচরা, খাদ্যসেবা ও গৃহস্থালি পর্যায়ের ক্ষতি ও অপচয় পরিমাপ করা হবে। তখন খাদ্যনীতির একটি নতুন প্রশ্ন সামনে আসবে কত খাদ্য উৎপাদন করেছি, তার পাশাপাশি কত খাদ্য রক্ষা করতে পেরেছি?

সরকারের উচিত ২০৩০ সালকে সামনে রেখে নিজস্ব বাস্তবতা ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তিবর্ষের ওপর একটি পরিমাপযোগ্য খাদ্য অপচয় হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১২.৩- ও ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য অপচয় কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ সেই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে।

শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। প্রতিবছর প্রকাশ করতে হবে জাতীয় খাদ্য অপচয় প্রতিবেদন। সেখানে থাকবে কত খাদ্য নষ্ট হয়েছে, কোন পর্যায়ে ক্ষতি বেশি, আগের বছরের তুলনায় কতটা কমেছে এবং নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাদ্যের কত অংশ পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। এতে খাদ্য অপচয় আর অনুমাননির্ভর আলোচনার বিষয় থাকবে না, এটি পরিণত হবে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির একটি পরিমাপযোগ্য সূচকে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, কারাগার, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং বড় সরকারি অনুষ্ঠানে খাবারের ব্যবহার ও অপচয়ের হিসাব রাখা যেতে পারে। কোথাও অতিরিক্ত খাবার প্রস্তুত হলে তার কারণ এবং নিরাপদ অব্যবহৃত খাবারের ব্যবস্থাপনার রেকর্ড থাকতে পারে। এটি আমলাতান্ত্রিক বোঝা নয়, এটি জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহারের অংশ।

একই সঙ্গে কৃষকের মাঠ থেকে খাদ্য নষ্ট হওয়ার কারণ কমাতে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে সংরক্ষণাগার, কোল্ড স্টোরেজ, উন্নত প্যাকেজিং, দ্রুত পরিবহন ও বাজারসংযোগ বাড়াতে হবে। কৃষককে শুধু উৎপাদনের দায়িত্ব দিয়ে থেমে গেলে চলবে না, উৎপাদিত পণ্য নিরাপদে বাজারে পৌঁছানো এবং ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিশ্চিত করাও খাদ্যনিরাপত্তার অংশ।

নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাদ্য পুনর্বণ্টনের জন্যও একটি জাতীয় কাঠামো প্রয়োজন। বড় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠান থেকে অব্যবহৃত নিরাপদ খাবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাদ্যনিরাপত্তাহীন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, সামাজিক সংগঠন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এতে যুক্ত হতে পারে। তবে নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাবার এবং নষ্ট খাবারের পার্থক্য কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে। অনিরাপদ খাদ্য বিতরণ কোনো সমাধান নয়।

খাদ্য অপচয় রোধের নৈতিক ভিত্তিও আমাদের সমাজে রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় করো না।” এই শিক্ষা সংযম ও দায়িত্বশীলতার কথা বলে। মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে খাদ্য অপচয়বিরোধী সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে। তবে সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি।

খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জনস্বাস্থ্যও গভীরভাবে যুক্ত। দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যাভাব ও অপুষ্টি মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে। অন্যদিকে অনিরাপদ খাদ্য নিজেই জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি। তাই উদ্বৃত্ত খাদ্য পুনর্বণ্টনের ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একইভাবে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা বা বাজারে সরবরাহ সংকটের সময়ে জাতীয় খাদ্য মজুত কতদিনের জরুরি চাহিদা পূরণ করতে পারবে, তারও নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, খাদ্য অপচয়কে জাতীয় সম্পদ অপচয় হিসেবে দেখতে হবে। সরকার কৃষি উৎপাদনে সহায়তা দেয়, কৃষক শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করেন, সেচে পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়, পরিবহনে জ্বালানি ব্যয় হয় এবং খাদ্য বাজারজাতকরণে অবকাঠামো ব্যবহৃত হয়। সেই খাদ্য যদি ব্যবস্থার কোনো ধাপে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে শুধু খাবার নয়, এসব সম্পদেরও একটি অংশ অপচয় হয়। তাই খাদ্যনিরাপত্তার নতুন দর্শন হতে পারে কত উৎপাদন হলো, কত রক্ষা করা গেল এবং প্রয়োজনের সময় কত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেল।

এখন সরকারের সামনে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। দেশে প্রতিবছর মোট কত খাদ্য নষ্ট হচ্ছে? কোন পর্যায়ে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি? কোন কৃষিপণ্য সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয়? সরকারি প্রতিষ্ঠানে খাদ্য অপচয়ের হিসাব কীভাবে রাখা হচ্ছে? নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাদ্য পুনর্বণ্টনের কাঠামো কোথায়? ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা কী এবং প্রতিবছর কতটা অগ্রগতি হচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনগণের জানার অধিকার আছে। কারণ খাদ্য শুধু ব্যক্তিগত ভোগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে কৃষকের শ্রম, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্বালানি, পরিবহন এবং মানুষের অর্থ জড়িত। খাদ্যের অপচয় কমানো গেলে কৃষকের উৎপাদনের মূল্য রক্ষা, বাজারের দক্ষতা বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানো সম্ভব। তাই এটি কোনো বিলাসী কর্মসূচি নয়, এটি জাতীয় সম্পদ রক্ষার কর্মসূচি।

আজ যে খাদ্য অযত্নে নষ্ট করছি, আগামীকাল সেই খাদ্যের অভাবেই কোনো পরিবারকে হয়তো কম খেতে হতে পারে। আজ যে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট করছি, আগামীকাল সেই পণ্যই হয়তো বেশি দামে কিনতে হতে পারে। আর আজ যে নিরাপদ খাবার ডাস্টবিনে যাচ্ছে, সেটি হয়তো কোনো ক্ষুধার্ত মানুষের একবেলার খাবার হতে পারত। তাই খাদ্যের অপচয়কে আর স্বাভাবিক সামাজিক দৃশ্য হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।

ক্ষুধার বাস্তবতা যেখানে এখনো আছে, সেখানে খাদ্যের অপচয় কোনো স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না।

খাদ্য মানুষের জন্য, ডাস্টবিনের জন্য নয়। এক মুঠো চালের পেছনে কৃষকের ঘাম আছে। এক কেজি সবজির পেছনে কৃষকের শ্রম আছে। এক প্লেট খাবারের পেছনে আছে জমি, পানি, জ্বালানি, পরিবহন, অর্থ এবং মানুষের পরিশ্রম। সেই খাদ্যের মর্যাদা রক্ষা করা শুধু ব্যক্তির দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

এখন সময় এসেছে উৎপাদনের হিসাবের সঙ্গে অপচয়ের হিসাব যুক্ত করার, খাদ্যের প্রতিটি ধাপকে জবাবদিহির আওতায় আনার এবং এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার, যেখানে খাদ্য উৎপাদনের পর ডাস্টবিনে নয়, মানুষের প্রয়োজনেই পৌঁছাবে। খাদ্যের প্রতিটি দানা শুধু খাবার নয়, এটি কৃষকের শ্রম, দেশের সম্পদ, মানুষের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা।

খাদ্যের অপচয়রোধ  শুধু অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের বিষয় নয়, এটি মানবিক, সামাজিক, ধর্মীয়  ও পরিবেশগত দায়িত্বও বটে। পৃথিবীতে একদিকে  বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে, অন্যদিকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হচ্ছে—যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাই খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার, পরিমিত ক্রয়, সঠিক সংরক্ষণ এবং উদ্বৃত্ত খাদ্য দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। খাদ্যের অপচয়রোধে  পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সবার  সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে খাদ্যের অপচয়রোধ  করে ক্ষুধামুক্ত ও সমৃদ্ধ সমাজ  গড়ে তুলতে। তাই খাদ্যের অপচয়রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।

 

লেখক পরিচিতি:

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি

যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি

ফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮, ০১৮৪২৬৩১১১৮

ইমেইল: lionganibabul@gmail.com

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews