
রিয়েল এস্টেট খাতে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের হানা !
দেশের আবাসন (রিয়েল এস্টেট) খাতে এক ভয়াবহ ও সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সন্ধান মিলেছে। বিনিয়োগ, মর্টগেজ, বায়না চুক্তি এবং চেকের মাধ্যমে জালিয়াতি করে একাধিক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে আর্থিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
আজ (মঙ্গলবার) এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই প্রতারক চক্রের বিশদ বিবরণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন ‘আলফালাক রিয়েল এস্টেট লিমিটেড’ এবং ‘মাইশা এম.এস. প্রোপার্টিজ লিমিটেড’। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আলফালাক রিয়েল এস্টেটের পরিচালক মো: ছিদ্দিকুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস. এম. জাকারিয়া এবং মাইশা এম.এস. প্রোপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: হায়দার আলী।
প্রতারণার মূল হোতা ও কৌশল:
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, জাপান প্রবাসী মো: ইকরামুল হক-এর অর্থায়নে তার ভাই মো: রিয়াজুল হাসান (অভি) ওরফে মিথুন এই সংঘবদ্ধ চক্রটি পরিচালনা করছেন। করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে আলফালাক রিয়েল এস্টেট লিমিটেড আর্থিক সংকটে পড়লে, পূর্ব পরিচিত রিয়াজুল হাসান তাদের এক কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন।
চুক্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় শেষে ৬০ লক্ষ টাকা লাভ দেওয়ার শর্তে কোম্পানির ব্র্যাক ব্যাংকের হিসাবের তিনটি নিরাপত্তা চেক গ্রহণ করেন রিয়াজুল। পরবর্তীতে চেক ছাড়াও অতিরিক্ত নিরাপত্তা হিসেবে তিনি মোহাম্মদপুর প্রকল্পের ৪টি ফ্ল্যাট এবং ৪টি কার পার্কিং মর্টগেজ (নিবন্ধিত বায়না চুক্তি) করার জন্য বাধ্য করেন। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ৩ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে একটি ফ্ল্যাট ও পার্কিং সাফ-কবলা রেজিস্ট্রিও করে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ধাপের প্রতারণা ও চেক জালিয়াতি:
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে রিয়াজুল হাসান তার বন্ধু মো: মাজহারুল ইসলামকে সাথে নিয়ে আরও দুটি ফ্ল্যাটের বিপরীতে ৭০ লক্ষ টাকা প্রদান এবং অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকা লাভ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আরেকটি ব্যাংক চেক হাতিয়ে নেন। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, তাদের দেওয়া চেকে কোনো অর্থই ছিল না। উল্টো ১২ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে রিয়াজুল কোম্পানির প্যাডে লিখিতভাবে স্বীকার করেন যে, মাজহারুল ইসলাম আলফালাক-এর এস. এম. জাকারিয়াকে কোনো অর্থই প্রদান করেননি।
চক্রটির প্রতারণার এখানেই শেষ নয়। ‘সুন্দরবন তালুকদার বিল্ডার্স লিমিটেড’ নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠানের ১ লক্ষ টাকার একটি চেক জালিয়াতি করে সেটিকে ৫১ লক্ষ টাকা বানিয়ে আদালতে প্রদর্শনের চেষ্টা করে এই চক্র। বিষয়টি আদালত কর্তৃক বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি (CID) ফরেনসিক শাখায় পাঠানো হলে ল্যাব পরীক্ষায় চেকে সংখ্যা সংযোজনের (জালিয়াতি) বিষয়টি প্রমাণিত হয়।
আলফালাক ও মাইশা প্রোপার্টিজ ছাড়াও সুন্দরবন তালুকদার বিল্ডার্সসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান এই একই চক্রের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
মামলা ও বর্তমান পরিস্থিতি:
বর্তমানে এই প্রতারণা ও জালিয়াতির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট একাধিক দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে আলফালাক রিয়েল এস্টেট লিমিটেড কর্তৃক দায়েরকৃত সি.আর. মামলা নং-১৭৮/২০২৬ এবং ২১৬/২০২৬ বর্তমানে পিবিআই (PBI)-এর তদন্তাধীন রয়েছে।
অন্যান্য সহযোগী ও অপপ্রচার:
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, রিয়াজুল হাসানের এই চক্রে শাহআলী থানা এলাকার রেজাউল আমিন (রাজু), মোস্তাফিজুর রহমান (মাসুম), হিটার সুমন এবং জহিরুল হকসহ আরও কয়েকজন জড়িত রয়েছেন। এই চক্রটি গত ১৯ জুন ২০২৬ তারিখে মিরপুর-১-এর সেকশন-১, ব্লক-জি-তে অবস্থিত আলফালাক-এর একটি সম্পত্তির দুটি দোকান জবরদখলের চেষ্টা চালায়। শুধু তাই নয়, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস. এম. জাকারিয়ার সাথে কোনো সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও তার বিকৃত ছবি সম্বলিত ব্যানার প্রদর্শন করে মানববন্ধনের নামে মিথ্যা অপপ্রচার ও মানহানিকর বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। এই ক্রমাগত হুমকি ও অপপ্রচারের কারণে এস. এম. জাকারিয়া ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
আবাসন ব্যবসায়ীদের দাবি:
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তদন্ত সংস্থার কাছে ৪টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন:
১. অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা।
২. তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩. ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে আইনি সুরক্ষা প্রদান করা।
৪. ভবিষ্যতে যেন কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান এমন পরিকল্পিত প্রতারণার শিকার না হয়, সেজন্য কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ব্যবসায়ীরা দেশের বিচার বিভাগের প্রতি পূর্ণ আস্থা ব্যক্ত করে এই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হাত থেকে আবাসন খাতকে রক্ষার জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।