রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় অবাধে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি (টপ সয়েল) কেটে নেওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। এতে জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
কৃষিবিদদের মতে, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে জমির অন্তত ১০ বছর সময় লাগবে। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পবা, মোহনপুর, তানোর, গোদাগাড়ী, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, চারঘাট, বাঘা, বাগমারা ও তাহেরপুর উপজেলার অন্তত ২০০টি ইটভাটায় ইট তৈরির জন্য ফসলি জমির এই উর্বর মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহে বাগমারা উপজেলার বেশ কয়েকটি ইটভাটাকে জরিমানা ও গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে প্রশাসনের বারবার অভিযানের পরও এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের একটি ইটভাটার টেকনিশিয়ান কামাল উদ্দিন জানান, একটি ইট তৈরি করতে প্রায় পাঁচ কেজি মাটি লাগে। বছরে একটি ইটভাটায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ইট উৎপাদন করা হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ মাটি। আর ইট তৈরির জন্য ‘টপ সয়েল’ বা উপরিভাগের মাটিই সবচেয়ে ভালো। ইটভাটার মালিকদের দাবি, কৃষকরা স্বেচ্ছায় এই মাটি বিক্রি করেন।
রামচন্দ্রপুর এলাকার ইটভাটা মালিক বাবু হোসেন বলেন, ‘ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা নিজেরাই মাটি বিক্রি করতে আগ্রহী। আমরা মাটি না কিনলে ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাবে, আর তাতে উন্নয়ন কাজ বিঘ্নিত হবে।’ মালিকপক্ষ কৃষকদের আগ্রহের কথা বললেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের কৃষক আলতাব উদ্দিন (৬৫) বলেন, ‘ইটভাটার মালিকেরা একসঙ্গে কয়েক বিঘা জমির মাটি কেটে নেয়। এতে পাশের জমিগুলো নিচু হয়ে যায়, ফলে সেচ ও চাষাবাদে সমস্যা হয়। তখন বাধ্য হয়েই আমাদের মাটি বিক্রি করতে হয়।’
বাগমারা উপজেলার কৃষক আবুল সরকার জানান, এক বিঘা জমির টপ সয়েল ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। শুরুতে এটি লাভজনক মনে হলেও পরে টানা কয়েক বছর আর ভালো ফলন পাওয়া যায় না। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ বিপর্যয় ও কৃষিজমির ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে। রাজশাহী জেলা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: নুরুল ইসলাম বলেন, ‘টপ সয়েলে জৈব উপাদান ও অণুজীব সবচেয়ে বেশি থাকে। এই স্তরটি সরিয়ে নিলে জমির উর্বরতা ফিরতে এক দশকের বেশি সময় লাগে।’
রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, এভাবে মাটি কেটে ফেলায় ফসল উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কবির হোসেন জানান, বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে এবং বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে ভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়াসহ জরিমানা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক আফিয়া আক্তার বলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা সরেজমিনে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ জানান, কৃষিজমি থেকে টপ সয়েল কাটা বন্ধে উপজেলা প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।