
কক্সবাজারে ৬২% সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই নেই প্রধান শিক্ষক!
মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ আমিন, কক্সবাজার
দেশের দক্ষিনে সর্বশেষ কক্সবাজার জেলায় প্রধান শিক্ষক সংকটের কারণে জেলার প্রাথমিক শিক্ষা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সরকার নানামুখি প্রদক্ষেপ গ্রহণ করলেও প্রধান শিক্ষক সংকটের কারণে পিছিয়ে পড়ছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি। জেলায় ৬৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাত্র ২৫৪ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। প্রধান শিক্ষকবিহীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৪০৩ টি। অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে সরকারের নানামুখি পদক্ষেপ মাঠে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তারা।
এমতাবস্থায় শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধি, সরকারের নানা কৌশল, কারিকুলাম বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) গুলশান আরা বলছেন – সহকারি শিক্ষকের শূন্য পদে সহসাই শিক্ষক নিয়োগ হলেও প্রধান শিক্ষকের পদ নানা কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্ব হচ্ছে। তিনি বলছেন পদোন্নতির জন্য পদ সংরক্ষণ করা হয়েছে। গ্রেডেশন তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। আশা করি শীঘ্রই শূন্য পদে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে এবং সংকট কেটে উঠবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়- সর্বশেষ ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে জেলায় ২৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। বিসিএস নন ক্যাডার থেকে কিছু সংখ্যক প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তবে সেটি যতেষ্ট ছিলনা। শিক্ষক সংকটের কারণে ১৩ বছর ধরে মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। সরকার শিক্ষার উন্নয়নে বাস্তবমুখী নানা পদক্ষেপ নিলেও প্রধান শিক্ষকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ পূরণে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন শিক্ষকরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে ৬৫ শতাংশ পদোন্নতি এবং ৩৫ শতাংশ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূরণের বিধান থাকলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না নানা কারণে। এছাড়া বিভিন্ন মামলা, আইনি জটিলতার কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে পারছে না প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দিলেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন হয়েছে—এমন অভিযোগে অনেক শিক্ষক আদালতে মামলা করে রেখেছেন। ফলে উদ্যোগ নিয়েও সারা দেশে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করতে পারছে না মন্ত্রণালয়।
কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ৬৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০৩টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। কর্মরত রয়েছেন ২৫৪ জন প্রধান শিক্ষক। কর্মরত প্রধান শিক্ষকের হার শতকরা ৬১.৩৩ শতাংশ। এছাড়া শূন্য রয়েছে ৩৫৫টি সহকারী শিক্ষকের পদও।
উপজেলা ভিত্তিক প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের পরিসংখ্যান হলো- কক্সবাজার সদর উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে ৬৪ টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছে ৩৫ জন। শূন্য রয়েছে ২৯ টি। রামু উপজেলায় ৪২ টি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ২৬ টি, শূন্য রয়েছে ৫৬ টি। ঈদগাঁও উপজেলায় ৩৯ টি প্রধান শিক্ষকের পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছে ৭ জন, শূন্য রয়েছে ৩২ টি। উখিয়া উপজেলায় ৭৮ টি প্রধান শিক্ষকের পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৪৩ জন শূন্য ৪৩টি। টেকনাফ উপজেলায় ৬৬ টি সরকারের প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্মরত রয়েছে ২২ জন, শূন্য রয়েছে ৪২ টি। চকরিয়া উপজেলায় ১০১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৫৭ জন। প্রধান শিক্ষক নেই ৪৬ টি স্কুলে। পেকুয়া উপজেলায় ৫৬ টি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ২৩ জন, শূন্য রয়েছে ৩৩ টি। মহেশখালী উপজেলায় ৭০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে কর্মরত রয়েছে ২৬ জন শূন্য রয়েছে ৪৪ জন। কুতুবদিয়া উপজেলায় ৫৯ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১৯টিতে, শুন্য রয়েছে ৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এছাড়া নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় ৪৪ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর মধ্যে মাত্র ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক রয়েছে। শূন্য রয়েছে চল্লিশটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন – প্রধান শিক্ষক সংকট থাকায় সহকারী শিক্ষককে ওই পদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে পাঠদানে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। প্রধান শিক্ষক ছাড়া পরিচালিত বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কাজ সাধারণত সহকারী শিক্ষক চালিয়ে নেন। সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিলে কর্মঘণ্টার বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকতে হয় প্রশাসনিক কাজে। ফলে পাঠদান ব্যাহত হয়। যার মাশুল দিতে হচ্ছে শিশুদের। এছাড়া অভিজ্ঞতা না থাকায় দাপ্তরিক কাজে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সহকারী শিক্ষকরা। প্রায় প্রতি সপ্তাহে দাপ্তরিক প্রয়োজনে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সভায় যোগ দিতে, নানা প্রশিক্ষনে ছোটাছুটি করতে হয়। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারিভাবে কোনো পারিশ্রমিকও দেয়া হয় না। এ অবস্থায় অতিরিক্ত দায়িত্বকে বোঝা হিসেবে দেখছেন অনেকে। দায়িত্ব পালনে অনেকে অনীহাও প্রকাশ করছেন। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যালয় থেকে সহকারী শিক্ষক কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ব্যাহত হচ্ছে পড়ালেখা।
প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে নিয়োগের বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ( ভারপ্রাপ্ত) গুলশান আরা বলেন, ‘ দীর্ঘদিন যাবৎ নানা জটিলতার কারণে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করা হয়নি। তবে নন-ক্যাডার থেকে কিছু কিছু নিয়োগ হলেও কক্সবাজারে তা খুবই নগন্য। শিক্ষক সংকট শুধু কক্সবাজারের নয়, এটি জাতীয়ভাবে হচ্ছে। পদোন্নতির জন্য প্রধান শিক্ষকের পদ সংরক্ষণ করা হয়েছে। পদোন্নতি সমাধান হলে শীঘ্রই আমরা প্রধান শিক্ষক পদ পূরণ করতে পারব। আশা করি সংকট কেটে যাবে। সহকারি শিক্ষকের শূন্য পদের নিয়োগ বিষয়ে তিনি বলেন, কক্সবাজারে ৩৫৫ টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য হলেও আগামী মাসের ১ তারিখ থেকে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ১৩৪ জন সহকারী শিক্ষক বিভিন্ন স্কুলে পদায়ন করা হবে। আশা করি সহকারী শিক্ষকের পদ পূরণ হলে শিক্ষক সংকট কিছুটা কেটে যাবে। পাঠদানে গতি আসবে।
কক্সবাজার সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল ইসলাম চৌধুরী জানান – শূন্য পদের বিপরীতে তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আগের নিয়ম অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া হলো ৩৫ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে এবং ৬৫ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে। ইতিমধ্যে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকার হাত দিয়েছেন। শীঘ্রই প্রধান শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করতে পারব আশা করি। এছাড়া বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে ঢেলে সাজাচ্ছে। ফলে শিক্ষারগণগতমান বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষার্থীরাও বাস্তব শিক্ষা কাজে লাগিয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। শিক্ষকদের জন্য ও নানামুখি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে সরকার।