
জলবায়ু সংকট ও কাজের ভবিষ্যৎ: টেকসই ও ন্যায্য বাংলাদেশের পথে যাত্রা !
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং জ্বালানি সংকট যৌথভাবে জনস্বাস্থ্য, শ্রম উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। “জলবায়ু সংকট ও কাজের ভবিষ্যৎ: টেকসই ও ন্যায্য বাংলাদেশের পথে যাত্রা” শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ (NAJTB)। এতে সহযোগিতা করেছে সাসটেইনেবল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন (SMEP) প্রোগ্রাম।বহুমাত্রিক জলবায়ু সংকট ও তীব্র তাপপ্রবাহের বাস্তব চিত্র
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মূল্যায়নে দক্ষিণ এশিয়াকে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ বর্তমানে চরম তাপমাত্রা ও জলবায়ুজনিত জীবিকা ঝুঁকির সর্বোচ্চ চাপ বহনকারী দেশগুলোর একটি। বক্তারা জানান, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে বাংলাদেশ ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে। উচ্চ আর্দ্রতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।২০২৬ সালেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) তথ্যমতে, দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে অবস্থান করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) সতর্ক করেছে যে, জুন-আগস্ট ২০২৬ সময়ে ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ, যা দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলবে।
অর্থনৈতিক বড় ধাক্কা: তাপমাত্রা বৃদ্ধির অর্থনৈতিক প্রভাবও মারাত্মক। ২০২৪ সালে শুধুমাত্র তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এর ফলে অর্থনীতির ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৪ শতাংশ। জ্বালানি অনিরাপত্তা ও শিল্প খাতে প্রভাব জলবায়ু সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র জ্বালানি অনিরাপত্তা। বাংলাদেশ বর্তমানে মোট প্রাথমিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি-নির্ভর। ২০২৬ সালের শুরুতে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করে। বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল এবং তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চরম তাপমাত্রা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সম্মিলিত প্রভাবে কারখানার ভিতরে এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকরা অসহনীয় কর্মপরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তৈরি পোশাক খাতে দীর্ঘমেয়াদি শঙ্কা কর্নেল ইউনিভার্সিটির আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, কার্যকর তাপ সহনশীলতা ও জলবায়ু অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ আঞ্চলিক তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় ক্ষতি এবং প্রায় ১০ লাখ সম্ভাব্য কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। নগরায়ন ও ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব বিগত শতাব্দীতে যেখানে গড় তাপমাত্রা সাধারণত ১৫ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে। ২০২৩ সালে রাজশাহীতে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে এবং ঢাকা, যশোর ও চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ন “আরবান হিট আইল্যান্ড” প্রভাবকে তীব্রতর করেছে। জলাধার, খাল, সবুজ অঞ্চল ও উন্মুক্ত স্থান ধ্বংস হওয়া এবং কংক্রিট অবকাঠামো ও বায়ুদূষণ বৃদ্ধির ফলে শহরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। উচ্চ আর্দ্রতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতায় ধস বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৪১ কোটি শ্রমিক প্রতিবছর অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকিতে কাজ করেন, যা লক্ষাধিক কর্মক্ষেত্র दुर्घटना ও মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। বাংলাদেশেও এই ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার মেগাসিটিগুলোর ওপর পরিচালিত গবেষণায় ঢাকা ও চট্টগ্রামকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। শারীরিক সমস্যা: অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, বমিভাব, পেশিতে টান, পানিশূন্যতা ও অজ্ঞান হয়ে পড়ার মতো তাপজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি রোগ: শরীরের রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ায় হৃদরোগ, তীব্র কিডনি জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। চরম তাপমাত্রায় হিটস্ট্রোক, অঙ্গ বিকল হওয়া এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য ও আক্রান্ত জনগোষ্ঠী: অতিরিক্ত তাপ কর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা, মনোযোগ ও শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারী শ্রমিক, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, বাইরে কাজ করা শ্রমিক এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। জাতীয় নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব। এই লক্ষ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, পরিবেশ আদালত আইন ২০১০, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন ২০১৩ এবং বিভিন্ন বিধিমালা (২০২১-২০২৩) কার্যকর করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইউনিসেফের সহায়তায় “তাপজনিত অসুস্থতা বিষয়ক জাতীয় নির্দেশিকা” প্রণয়ন করেছে এবং ২০২৬-২০৩১ মেয়াদের জন্য স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার দুর্বল বাস্তবায়ন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের শ্রম আইনে তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় নির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। উচ্চ তাপমাত্রায় কাজের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, নিরাপদ কর্মঘণ্টা বা তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিকে পেশাগত ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কার্যকর বিধান এখনও অনুপস্থিত। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলো কার্বন নির্গমন হ্রাসে জোর দিলেও শ্রমিকদের তাপ সহনশীলতা ও অভিযোজন ব্যবস্থাকে প্রায় উপেক্ষা করছে। সংকট উত্তরণে ৫ দফা কৌশলগত সুপারিশ গোলটেবিল বৈঠকে জলবায়ু সংকট ও কাজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ৫টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করা হয়: বাধ্যতামূলক তাপ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন: বাংলাদেশ শ্রম আইনে জলবায়ু-সংবেদনশীল পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা (OSH) মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা। নির্দিষ্ট তাপমাত্রার পর বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং চরম তাপে বহিরাঙ্গন কাজ বন্ধ রাখার বিধান প্রণয়ন। শীতলীকরণ ও সবুজ অবকাঠামো পুনরুদ্ধার: খাল, জলাধার ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা পুনরুদ্ধার করা; পরিবেশবান্ধব নগর বনায়ন কার্যক্রম জোরদার করা এবং বহুতল ভবনে গ্রিন রুফ (ছাদ-বাগান) প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা: জলবায়ু-সংবেদনশীল অপ্রাতিষ্ঠানিক ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকদের জন্য তাপপ্রবাহভিত্তিক বীমা, জরুরি নগদ সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ন্যায্য রূপান্তর: আমদানি-নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শ্রমিকবান্ধব ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা। জন সচেতনতা বৃদ্ধি: তাপজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি সেবার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা ও প্রস্তুতি জোরদার করা। পরিশেষে বলেন, ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ এখন আর কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি শ্রম, জনস্বাস্থ্য, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। সমন্বিত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু-সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্য উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক উদাহরণ স্থাপন করতে পারে।