
নবীনগরে কৃষিতে যুক্ত হলো নতুন সম্ভাবনাময় ফসল ক্যাপসিকাম। এই প্রথমবারের মতো উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে ক্যাপসিকামের আবাদ শুরু হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে কুমিল্লা অঞ্চলের টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার পৌরসভা, লাউরফতেহপুর, সাতমোড়া, বীরগাঁও, জিনদপুর ইউনিয়নের একাধিক স্থানে প্রায় ১০ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ক্যাপসিকাম আবাদ হচ্ছে।
ক্যাপসিকাম একটি জনপ্রিয় সবজি, যা মিষ্টি মরিচ নামেও পরিচিত। সবুজ, লাল ও হলুদ—এই তিন রঙের ক্যাপসিকাম বাজারে বেশি দেখা যায়।
এতে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশি থাকায় এটি মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। পাশাপাশি বাজারে এর চাহিদা ও দাম তুলনামূলক ভালো হওয়ায় কৃষকদের জন্য এটি লাভজনক ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বাদে ঝাল না হলেও পুষ্টিগুণে এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং আধুনিক রান্নায় এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্যাপসিকাম চাষে তুলনামূলক কম জমি ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে আবাদ করতে ২০০০ থেকে ২২০০ চারা প্রয়োজন। এক বিঘা জমিতে কৃষকদের চারা ক্রয়, অন্যান্য উপকরণ ক্রয়সহ ৫৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা হলে চারা রোপণের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যেই প্রথম ফল সংগ্রহ করা সম্ভব হয় এবং এরপর ৭ থেকে ১০ দিন পরপর ফল তোলা যায় কমপক্ষে ৩ মাস পর্যন্ত ফলে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত আয় নিশ্চিত হচ্ছে কৃষকদের। এই মূহুর্তে খুচরা বাজারে ক্যাপসিকামের মূল্য ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠানামা করছে। এক বিঘা জমিতে গড়ে ৩ থেকে ৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব বলে জানায় মাঠ পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি অফিসারবৃন্দ।
নবীনগর উপজেলাজুড়ে আবাদকৃত ক্যাপসিকাম এরই মধ্যে মাঠে আশাব্যঞ্জক ফলন দেখা গেছে। সাতমোড়া ইউনিয়নের মাধবপুর মহল্লার প্রবাস ফেরত কৃষি উদ্যোক্তা হবি মিয়া জানান, উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে একটি উচ্চমূল্যের ফসল প্রদর্শনী বরাদ্দ পাই, পরবর্তীতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সফুরুল্লাহ সাহেবের পরামর্শে সঠিক পরিচর্যা ও আধুনিক চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে ক্যাপসিকাম আবাদ করেছি। ক্যাপসিকাম চাষে লাভের পরিমাণ অন্যান্য অনেক সবজির তুলনায় বেশি। বিশেষ করে ক্যাপসিকামের বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় আয় আরও বাড়ছে। মালচিং পেপার দিয়ে আগাম মালচিং করেছি। আগামীতে পলিনেট হাউজের মাধ্যমে বড় পরিসরে অফ সিজনেও আবাদ করবো।
উচ্চমূল্যের ফসল আবাদের সম্ভাবনা নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম লিটন জানান, নবীনগর উপজেলায় শিক্ষিত তরুণ এবং উদ্যমী কৃষকদের বাণিজ্যিক কৃষিতে সংশ্লিষ্টতা বাড়াতে আমরা বিভিন্ন প্রকল্পের সহায়তায় কৃষি উপকরণ, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এই বছর প্রথম নবীনগর উপজেলায় ১০ বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম আবাদ হচ্ছে। উন্নত জাতের বীজ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই দমনে সচেতন হলে ক্যাপসিকাম হতে পারে নবীনগরের একটি সম্ভাবনাময় ফসল। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আমরা স্থানীয় সুপারশপ, আড়তদার এবং রেস্টুরেন্টের সাথে কৃষকদের সংযোগ সৃষ্টি করার কাজ করে দিচ্ছি।
ক্যাপসিকাম আবাদের গুরুত্ব নিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডঃ মোস্তফা এমরান হোসেন জানান, শীতকালীন সবজি হিসেবে ক্যাপসিকাম এখন কৃষকদের কাছে একটি লাভজনক ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে চারা রোপণ করে ডিসেম্বর থেকেই ফল সংগ্রহ শুরু করা যায়। একবার গাছে ফল আসলে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত উত্তোলন করা সম্ভব হয়।
দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরাঞ্চলের ন্যায় ক্যাপসিকামের চাহিদা গ্রামাঞ্চলে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুড দোকানে ক্যাপসিকামের ব্যবহার বেড়েছে কয়েকগুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যাপসিকামে থাকা ভিটামমিন C ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী হওয়ায় ভবিষ্যতে এর বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে।