
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কাউতলী জেলা পরিষদ মার্কেটের সিঁড়িতে পড়ে থাকা সেই বৃদ্ধের পরিচয় মিলেছে। তিনি বেওয়ারিশ নন, বরং এক বুক অভিমান নিয়ে ঘরছাড়া হওয়া ইসমাইল মিয়া (৬৫)। ময়নাতদন্ত ও পরিচয় শনাক্তের পর বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাতে পারিবারিকভাবে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
ষড়যন্ত্র ও বিচ্ছেদের করুণ ইতিহাস:
জানাজায় অংশ নেওয়া ইসমাইল মিয়ার ছোট মেয়ের জামাতা হাফেজ মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। তিনি বলেন, “বিয়ের পর আমি আমার শ্বশুরকে দেখিনি। পরিবার থেকে তার ব্যাপারে জানতে চাইলে কেউ গুরুত্ব দিত না। পরে আমার স্ত্রীর কাছে শুনেছি, আমার মামা শ্বশুরসহ পরিবারের কিছু সদস্য মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এবং ভুয়া কাগজে টিপসই নিয়ে জোরপূর্বক তাকে সংসার থেকে বের করে দিয়েছিল।”
সহজ-সরল ইসমাইল মিয়া এই অপমান ও বঞ্চনা সইতে না পেরে অভিমান করে ভবঘুরে জীবন বেছে নেন। দীর্ঘ ১০-১৫ বছর তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাউতলী এলাকায় রাস্তাঘাটে রাত কাটাতেন।
পরিচয় ও শেষ বিদায়:
নিহত ইসমাইল মিয়ার আদি বাড়ি নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার হাজিবাগান গ্রামে। তিনি নবীনগরের নোয়াগাঁও উত্তর পাড়ায় বিয়ে করে ঘরজামাই থাকতেন। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে; এক ছেলে বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন। বুধবার রাতে কাউতলী বায়তুল আমীর মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজ পড়ান তার ছোট মেয়ের জামাতা হাফেজ ইসমাইল হোসেন। পরে কাউতলী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
পালক পরিবারের মানবিকতা:
১০ বছর বয়স থেকে ইসমাইল মিয়া কাউতলী এলাকার সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল বারেকের বাড়িতে পালক সন্তান হিসেবে বড় হয়েছিলেন। শেষ বিদায়ের সময়ও সেই পালক পরিবারই এগিয়ে আসে। তাদের তত্ত্বাবধানেই সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
প্রশাসনের বক্তব্য:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, বার্ধক্য ও শীতজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত করা হয়েছে এবং মরদেহটি তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর-এর প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আজহার উদ্দিন বলেন, “ইসমাইল মিয়ার পরিচয় শনাক্ত হওয়াটা স্বস্তির। পরিবার বা স্বজনদের অনুপস্থিতিতেও পালক পরিবারের এই উদ্যোগ মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
সহজ-সরল একজন মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক চাপ, ষড়যন্ত্র ও একাকীত্ব কীভাবে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, ইসমাইল মিয়ার জীবন তারই এক মর্মান্তিক দলিল হয়ে রইল।