
বৈরি আবহাওয়ায় কাঁপছে সারাদেশে। কুয়াশা ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে সূর্য মামা। “অপূর্ব সৌন্দর্যে আকৃষ্ট প্রকৃতিকন্যা” নিলাভূমি জুড়ে শস্যের ভান্ডার দেখলে মনে পড়ে ফেলে আসা অতীত। দীর্ঘ দিনের বিভিন্ন ক্যাটাগরির অনুসন্ধানের পরিদর্শনে জানা গেছে,
প্রদীপ্ত মানিকগঞ্জ জেলার নদী খাল বিলের বেহাল দশা। কৃষি জমি নিধনে মহাপরিকল্পনায় ব্যস্ত বালু খেকো, মাটি খেকো ও ভূমি দস্যুরা। শীত মৌসুমে অতিথি পাখি শিকারে ব্যস্ত পাখি শিকারিরা। হতাশদৃষ্টিতে জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে মধ্য ভাটির প্রদীপ মানিকগঞ্জ জেলা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকের ঘুম ভাঙ্গেনি অভিযোগ রয়েছে বস্তা বস্তা। প্রমত্তাপদ্মা, যমুনাসহ ১৪টি শাখা নদী প্রবাহিত মানিকগঞ্জ জেলার উপর দিয়ে। অসংখ্য খাল বড়ো বড়ো বিলও। বেশকয়েকটি নদী খাল বিলের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে এ-জেলা কার্যত মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। এ জেলার নদীগুলোর মধ্যে প্রমত্তাপদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, মরাকালীগঙ্গা , ধলেশ্বরী , পুরাতন ধলেশ্বরী, নুরানীগঙ্গা, ইছামতী, কান্তাবতী, গাজীখালী, ক্ষিরাই, মনলোকহানী, নোয়াই, ভুবনেশ্বরনদীসহ কৃষি জমির সর্বনাশ করছে আধিপত্যপন্হী প্রভাশালী সিন্ডিকেটরা । অভিযোগ উঠেছে, নদী ও খাল খনন প্রথা অমান্য করে অপরিকল্পিত ভাবে ধারাবাহিক ভাবে কৃষিজমির সর্বনাশ এবং ইজারা বহির্ভূত স্থান থেকে অবৈধ পন্থায় অপরিকল্পিত ভাবে নদীর বালু লুটপাট করে এই জেলার মানচিত্র গিলে খাচ্ছে তারা। অধরা একটি সিন্ডিকেট অপশক্তির ক্ষমতায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধ্বংসের মুখে ফেলেছে । এঅবস্থায় বেড়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমনকি মনুষ্যবসতির উপযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে । গ্লোবাল ফুট প্রিন্ট নেটওয়ার্কের এক রিপোর্টে সম্প্রতি উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত গড়ে ৪ দশকের ব্যবধানে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক রকমের ধস নেমেছে।
এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৩০৯ প্রজাতির বিভিন্ন জীব জন্তূর মধ্যে ১ হাজার ২৩৫ টি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭ ভাগ। বর্তমানে প্রতি বছর জীববৈচিত্র্য হারানোর প্রবনতা ধারনা হচ্ছে । ২০৩০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে
৫১ ভাগ জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাবে। মারাত্মক অবনতির ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। কৃষি জমি, বনভূমি, সাগর সম্পদের ওপর অতি নিকটে পৌঁছে গেছে খাদ্য, পানি ও জ্বালানি সংকট। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা তাঁদের জলবায়ু প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত বছর বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিলো ১ দশমিক ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। আবহাওয়া সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ হতে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্ষণ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় প্রকৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি ঘটেছে। জীব বিজ্ঞানীদের গবেষণায় জানা গেছে, আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনে ২০ প্রজাতির পাখি বিলুপ্তি হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কানাবগিলা, পানকৌড়ি,কাঠঠোকরা তিলাঘুঘু, শকুন,চিল, মাছরাঙা,বখিলা,কানাকুখা, ঘুঘু, পেঁচা , হুতুম পেঁচা উল্লেখ যোগ্য। এছাড়া গুইসাপ,বেজি,নেউল প্রভৃতি সরীসৃপ জাতীয় প্রাণি প্রায় বিলুপ্তি ঘটেছে। বিলুপ্তি ঘটেছে নন্দই, ভাদা,চেলা,পুঁটি,চাপলা, খলিসা,বেতকাটা, পারদা, ফ্যাসা, বাইম, ফোলি ,কালিবাউস প্রভৃতি দেশি প্রজাতির সুস্বাদু মিঠা পানির মাছ। জীব বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, নদ নদী ও খাল বিলের অস্তিত্ব হারানো শহর বন্দরও গ্রামের অসংখ্য পুকুর জলাশয় ভরাট করে বসতি গড়ে তোলা ও আবাদী জমিতে বসতি করার ফলে দেশের জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে,১৯৪৫ খ্রীষ্টাব্দে মানিকগঞ্জ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মহকুমার উত্তর সীমান্তে টাঙ্গাইল জেলা, পশ্চিমে যমুনা, পশ্চিম দক্ষিণে পদ্মা এবং দক্ষিণ সীমান্তে রাজবাড়ী ও ফরিদপুর জেলা এবং পূর্বে ঢাকা জেলার অবস্থান। অথচ রাজধানীর সাথে মানিকগঞ্জ জেলা , অথচ উন্নয়নের তেমন কোন ছোঁয়া লাগেনি। ঘিওর দৌলতপুর শিবালয় সাটুরিয়া হরিরামপুর সিংগাইর ও মানিকগঞ্জ সদরসহ ৭টি উপজেলার ১৩৮৩.৬৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তন নিয়ে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মানিকগঞ্জ জেলা গঠিত হয়। সুত্রে জানা গেছে, এ জেলার লোক সংখ্যা প্রায় ১৩,৯২,৮৬৭ জন। গবেষণায় উল্লেখ যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের মধ্য ভাটির অঞ্চলভূক্ত মানিকগঞ্জ জেলার ভূভাগ নদী বাহিত পলি দ্বারা গঠিত। এ জেলায় কৃষি জমির পরিমাণ ৯৯,৮২০ হেক্টর। বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে দেখা গেছে, নদী ও খাল খনন প্রথা অমান্য করে অপরিকল্পিত ভাবে মানিকগঞ্জ জেলার সর্বনাশ করেছে একটি সুবিধাবাদি সিন্ডিকেট। ভোগান্তি এলাকার ভুক্তভোগী জনতার অভিযোগ, আওয়ামী জাহেলি লীগ যুগে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গ সংগঠনগুলো এবং মহাজোটের শরীক দলগুলো এই অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে খননের নামে নদীর বালু লুটপাট, ভেকু দিয়ে আবাদী জমির মাটি কেটে ব্যাপক সর্বনাশ করেছে। ডেমি নির্বাচনে বিজয়ী অধরা সিন্ডিকেটের জনৈক সদস্যরা দেশের ৩ ফসলি কৃষি জমির টপসয়েল কেটে ইটভাটায় পুড়িয়ে মানিকগঞ্জ জেলার মানচিত্র গিলে খেয়ে পরিবেশ দূষণ করেছে। কৃষি জমির বেশির ভাগ মাটি পোড়ানো হচ্ছে ঘিওর উপজেলার স্টোন ব্রিকসে। ভয়ানক পরিবেশ দূষণ, দুর্গন্ধে অতিষ্ট মহল্লা ও ওয়ার্ল্ড থেকে জেলা শহর পর্যন্ত আবর্জনায় বিপর্যয়ের মুখে জনদুর্ভোগে পরিনত হয়েছে মানিকগঞ্জবাসী। এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। তাঁরা বলেন, জনবল সংকটের কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে সময়ের ব্যাপার। অভিযোগ উঠেছে, মানিকগঞ্জ – ৩ আসনের সাবেক এমপি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাহিদ মালেক, মানিকগঞ্জ -২ আসনের সাবেক এমপি বাউল শিল্পী মমতাজ বেগম, মানিকগঞ্জ -১ আসনের সাবেক এমপি নাঈমুর রহমান দুর্জয় এবং তাঁদের আশেকানেরা এই জেলার সর্বনাশে নদী, কৃষি জমি নিধনের মাস্টার মাইন্ড ছিলেন। আওয়ামী জাহেলি লীগ যুগে বিভিন্ন সড়কে খোঁড়া খুঁড়ি, লোক দেখানো অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের কারণে ধুলাবালিতে অতিষ্ট ছিলো মানিকগঞ্জবাসী। তাঁদের এই অবৈধ কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কেউ টুঁশব্দটিও করার সাহস পায়নি। এতে মানুষ অসুস্থ হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের বিপর্যয় হয়েছে। দীর্ঘ দিনের রামরাজত্বে অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, অবৈধ ক্লিনিক, অবৈধ ইটভাটাসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ একটা হযবরল অবস্থা।
৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও বিভিন্ন ইউনিয়নে ক্লিনিক পরিদর্শনে দেখা গেছে একই অবস্থা।
রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। ব্যাঙের ছাতার মত ক্লিনিক গুলোতে চলছে নিন্মমানের সেবা প্রদানের নামে চলছে অর্থ বাণিজ্য। বাসগৃহ গৃহপলি বর্জ্য,মানব বর্জ্য, ক্লিনিক বর্জ্যসহ এজেলা এখন আবর্জনার ভাগাড়ে পরিনত হয়েছে মানিকগঞ্জ শহর। মানিকগঞ্জ শহর খাল সৌন্দর্য বর্ধনের নামে কতো নাটক। টোকাই থেকে ধনকুবের মালিক জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শীর্ষ দুর্নীতিবাজ সাবেক মেয়র রমজান আলী ধ্বংস করেছে মানিকগঞ্জ পৌর। সাবেক পৌর মেয়র রমজান আলী পলাতক থাকায় তাঁর বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য, জনস্বার্থে কৃষি জমি রক্ষার্থে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছেন মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তর। তাঁদের এই অভিযান চলমান থাকবে বলে জানান, মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট ফয়জুন নেছা। মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুলাহ আল মামুন বলেন,
পরিবেশ রক্ষায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। জেলায় বর্তমানে ১২০টি ইটভাটা কার্যক্রম চালু রয়েছে, যার মধ্যে ১৬ টি ইটভাটা অবৈধ বলে জানান তিনি। তিনি আরো জানান, সাটুরিয়া উপজেলার ফৌজিয়া ও সদর উপজেলার হাজী ব্রিকসে অভিযান চালিয়ে ইটভাটার চিমনি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ৩টি ইটভাটাকে প্রতিটিকে ৬ লাখ করে মোট ভোট ১৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সমাজের বিশিষ্ট জনদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন হলো বর্তমানে নতুন জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা মানিকগঞ্জ এসেছে তিনি অবশ্যই মানিকগঞ্জ জেলার অনিয়ম ও দুর্নীতি মুক্ত করবেন। তাঁর সার্বিক চেষ্টায় মানিকগঞ্জ জেলার কৃষি জমি, নদী খাল বিল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে।