
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জামালপুর জেলা কারাগারের হাজতি হযরত আলী মৃত্যু ঘটনায় রবিবার থেকে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করা হবে বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
অন্যদিকে শনিবার সকাল নয়টায় নিহত হযরত আলীকে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিংটিমারী এলাকায় জানাযা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এদিকে জামালপুর জেলা কারাগারের জেলার লিপি রানী সাহা বাদী হয়ে শুক্রবার রাতেই জামালপুর সদর থানায় বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর বালুরগাঁও গ্রামের মৃত ছামিউল হকের ছেলে রহিদুল মিয়া (৪০) কে প্রধান আসামী করে মামলা দায়ের করেছেন । এ মামলা পরই জামালপুর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো: নাজমুস সাকিবের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকালে জেলা কারাগারের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
জেলা কারাগার সুত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে কারাগারের ভেতরে কাশি ও থুথু ফেলাকে কেন্দ্র করে পাগলা হযরতের সঙ্গে কথা কাটাকাটি ও তর্কাতর্কি শুরু হয় অন্য হাজতী রহিদুর মিয়ার। এক পর্যায়ে রহিদুর মিয়া শৌচাগারের দরজার একটি কাঠের টুকরা দিয়ে পাগলা হযরতের মাথায় পরপর বেশ কয়েকবার আঘাত করে। পরে দায়িত্বরত কারারক্ষী ও অন্যান্য হাজতিরা আহত মো. হযরত আলী (২৫)কে উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে সেখানেও অবস্থার অবনতি দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে। শুক্রবার সকাল ১১ টায় তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
তবে কারাগারের ভেতরের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে নাম প্রকাশ না শর্তে একাধিক ব্যক্তিরা জানান, ব্রহ্মপুত্র ৪ টি, মেডিকেল ১টি,রজনীগন্ধা ১ টি, এমডি ১ টি, যমুনা ১ টি,আমদানীর ওয়ার্ড গুলোতে হাজতী কিংবা কয়েদিরা দিনের বেলায় ওয়ার্ডের শৌচাগারগুলোতে প্রবেশ করতে পারে না। পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র ৪ টি, মেডিকেল ১টি,রজনীগন্ধা ১ টি, এমডি ১ টি ওয়ার্দের হাজতীদের কোন জরুরী কাজ ছাড়া কখনো যমুনা ওয়ার্ডের পাশে আসতে পারে না এবং কেস টেবিলের দিকেও যেতে পারে না। ব্রক্ষপুত্র ৪ ওয়ার্ডের মাঝামাঝি হাজতীদের জন্য হাউজে গোসল ও পাশেই ৩ টি শৌচাগারের ব্যবস্থা রয়েছে। দিনের বেলায় তারা হাউজের পাশের ৩ টি শৌচাগার ব্যবহার করেন। সেখানে কাঠের দরজা তো দুরের কথা প্লাষ্টিকের কোন দরজা নেই। হাজতীরা তাদের লুঙ্গি ছিড়ে পর্দা বানিয়ে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে যমুনা ওয়ার্ডের পাশে যে শৌচাগারটি রয়েছে সেখানে দিনের বেলায় আমদানী ও যমুনা হাজতীরা শৌচাগার ব্যবহার করেন। কোন ওয়ার্ডের ভিতরে শৌচাগার দিনের বেলায় কেউ ভুলে একবার ব্যবহার করলেও তাকে ওয়ার্ডের রাইটার অশ্লীল গালিগালাজ করে পাঠিয়ে দেয় কেস টেবিলে। আর কেস টেবিলে শাস্তি স্বরুপ করা হয় নির্যাতন। তবে কাঠের দরজার টুকরা পাওয়ার দাবিটি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। কাঠের টুকরা শৌচাগারে এতো নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আসে এ নিয়েও নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে সচেতন মহলের প্রশ্ন হাজতীদের মধ্যকার মারামারি হলে সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? কেউ কেউ ধারণা করছেন, হাজতিকে নির্যাতনের ঘটনা আড়াল করতেই “মারামারি”র কথা বলা হচ্ছে। কারাগার কর্তৃপক্ষ হযরত আলীকে পাগল বলে দাবী করার প্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয়েছে আরো নানা প্রশ্ন কেননা গত অক্টোবর মাসে জেলা কারাগারে ৫/৬ জন পাগলদের দেখাশুনা করার জন্য সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজন কয়েদি(সেবক) নিয়োগ প্রদান করে কর্তৃপক্ষ। সেই সময় সেই সেবকরা কোথায় ছিলেন?
এমনও হতে পারে কারা রক্ষীদের নির্যাতনে মারা যায় হযরত আলী। সেটা লুকানোর জন্যই দাবী করা হয়েছে মারামারি এবং হযরত আলীকে বানানো হচ্ছে পাগল ।
এদিকে সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে হযরত এর বাবা ইমান হোসেন জানান, আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। এখানে যারাই জড়িত থাকুক সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।
হযরত এর ফুফু জানান, আমার ভাতিজা দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আমরা বিচার চাই।
এ দিকে জামালপুর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো: নাজমুস সাকিব জানান, থানায় মামলা হয়েছে। এই ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো জানান, যদি কাউকে জড়িত পাওয়া যায় তদন্ত স্বাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে জামালপুর জেলা কারাগারের জেলার লিপি রানী সাহাকে শনিবার বিকাল ৪ টায় মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় কারা উপ মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, আগামী রবিবার থেকে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করা হবে। এই তদন্তে যদি কোন কারা কর্তৃপক্ষের জড়িত পাওয়া যায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শৌচাগারে কিভাবে কাঠের টুকরা আসল এটাও খতিয়ে দেখা হবে।