
‘রেল রাজা’ শাহ্ আলমের উত্থান ও অপতৎপরতা রেল খাতে দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি চিত্র তুলে ধরে। এক সময় বিএনপির প্রধান নেতা তারেক জিয়ার পরিচয়ে রেল খাত থেকে নানা ধরনের অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করে চলছিলেন শাহ্ আলম। রেলের সম্পত্তি, টেন্ডার, দোকান, স্টেশন, এবং আবাসিক হোটেল দখলে নিয়ে তিনি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন। তিনি রেল স্টেশনের দোকান থেকে শুরু করে ক্যাটারিং, অন-বোর্ড সেবা এবং বিজ্ঞাপন পর্যন্ত সবকিছুর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শাহ্ আলম দ্রুত নিজের পরিচয় বদলে ফেলে যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেন। বাবর ও আইয়ুব আলীর মতো প্রভাবশালী যুবলীগ নেতাদের সহযোগিতায় তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন এবং তার অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রেলের বিভিন্ন সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে লিজে নেয়া হয়, যা সরকারি রাজস্বের ক্ষতির পাশাপাশি রেলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাকেও ব্যাহত করছে। শাহ্ আলম ও তার সহযোগীরা বিভিন্ন সরকারি ট্রেনের অন-বোর্ড ক্যাটারিং এবং যাত্রী সিটের কভার পরিষ্কার ও বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। স্টেশন ও ট্রেনের বগিগুলোতে এলইডি টিভি বসিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে, যা থেকে আয় করা টাকার একটি বিশাল অংশ রেলের খাতে না এসে সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন স্টেশনের পার্কিং স্পেস এবং দোকানগুলোতে বেআইনি ভাড়া দিয়ে এসব জায়গাকে মাদক ও জুয়ার আসরে পরিণত করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় শাহ্ আলম, বাবর, এবং আইয়ুব আলীর এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাদের দুর্নীতি ও অপতৎপরতার খবর প্রকাশিত হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তারা রেলের সম্পদ লুটপাট অব্যাহত রাখে।
বর্তমানে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর বাবর ও আইয়ুব আলী পালিয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে শাহ্ আলম আবারও তার পুরনো কৌশল প্রয়োগ করতে শুরু করেছেন। বিএনপির নাম ব্যবহার করে তিনি রেল খাতে আগের মতোই প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছেন। আবারও তারেক জিয়ার পরিচয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে রেল খাত থেকে অবৈধ সুবিধা নিতে সচেষ্ট তিনি,বর্তমানে শাহ্ আলম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাধিক সরকারি সংস্থা তদন্তে নেমেছে। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চলছে। শাহ্ আলমের সিন্ডিকেটের অধীনে রেলের সম্পত্তি, স্টেশন সংলগ্ন হোটেল ও দোকানে মাদক ও চোরাচালানের ব্যবসা চালানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। রেলওয়ের অবৈধ লিজ, টেন্ডার জালিয়াতি, এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো অপরাধের অভিযোগেও তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
শাহ আলমের এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে রেল খাতে দুর্নীতি একটি সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। রেলের বিপুল সম্পদ অবৈধভাবে নিজেদের পকেটে ঢোকানোর পাশাপাশি সিন্ডিকেটটি রেলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার পথে প্রধান বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। রেল খাতে একটি দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই সিন্ডিকেটের কার্যকলাপের ওপর কঠোর নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় রেল খাতের এই অস্থিরতা দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে রেলকে রক্ষা করা এবং দুর্নীতি বন্ধ করা এখন দেশের সাধারণ মানুষের দাবি হয়ে উঠেছে। জনগণের সম্পদ রক্ষা এবং রেলের সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।