বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন!

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬



শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন!

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

শ্রমিকরা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি। অর্থনীতি কেবল বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রপ্তানি আয় বা উন্নয়নের পরিসংখ্যানে এগিয়ে যায় না। অর্থনীতির  ভিত গড়ে ওঠে শ্রমিকদের  শ্রমে, যারা কারখানা, নির্মাণক্ষেত্র, পরিবহন, কৃষি, দোকান, গৃহস্থালি ও নানা সেবাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন কাজ করেন। তাঁদের শ্রমে উৎপাদন সচল থাকে, পণ্য বাজারে পৌঁছায়, শিল্প টিকে থাকে এবং অর্থনীতির চাকা ঘোরে। অথচ উন্নয়নের এই যাত্রায় শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার ও কল্যাণ অনেক সময়ই উপেক্ষিত হয়।

শ্রমিকের অধিকার বলতে শুধু মাস শেষে বেতন পাওয়াকে বোঝায় না। ন্যায্য মজুরি, নিয়মিত বেতন, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, চিকিৎসাসুবিধা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, ছুটি, বকেয়া পরিশোধ এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ এই  সবই এর অংশ। কাজের বিনিময়ে একজন শ্রমিক যেন নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারেন, সেটিও ন্যায্যতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। এসব অধিকার কাগজে থাকলেই হবে না; কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।

 

শ্রমজীবী মানুষের জীবনে মজুরির প্রশ্নটি সবচেয়ে মৌলিক। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার খরচ বাড়লে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপও বাড়ে। নির্ধারিত মজুরি যদি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকে, তাহলে একজন শ্রমিককে খাবার, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের পড়াশোনার মতো প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয়নি।  পরিবার চালাতে অনেককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়, ঋণ নিতে হয় অথবা প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হয়। এতে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ পড়ে।

মজুরি নির্ধারণ তাই এককালীন সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়। জীবনযাত্রার ব্যয়, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের অবস্থা ও শ্রমিক পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট বিরতিতে মজুরি পর্যালোচনা করা দরকার। এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। আলোচনায় শ্রমিকের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পরিবারের ব্যয়ের চিত্র যেন যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়। সিদ্ধান্তের ভিত্তি, সময়সীমা এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতিও স্পষ্ট থাকা জরুরি। এতে মজুরি নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ সমাধানের সুযোগ বাড়বে।

মজুরি ঘোষণার পর সেটি সময়মতো পরিশোধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বেতন বা অতিরিক্ত কাজের পাওনা আটকে থাকলে শ্রমিকের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি সংকট তৈরি হয়। অনেক শ্রমিকের সঞ্চয় থাকে না,  মাসের নির্দিষ্ট তারিখে বেতন না পেলে ভাড়া, খাবার, ওষুধ বা ঋণের কিস্তি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বেতন পরিশোধের সময়সীমা কঠোরভাবে মানা, বকেয়ার অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং পাওনা আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। শ্রমিক যেন নিজের পাওনা চাইতে গিয়ে চাকরি হারানোর ভয় বা হয়রানির মুখে না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের অধিকার শ্রমিকের স্বাস্থ্য এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ সময় কাজ, পর্যাপ্ত বিরতির অভাব এবং অতিরিক্ত কাজের জন্য যথাযথ পারিশ্রমিক না দেওয়া শ্রমিকের ওপর শারীরিক চাপ বাড়ায়। রাতের পালায় কাজ করা, ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্র পরিচালনা কিংবা গরম ও বদ্ধ পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকা এসব ক্ষেত্রে বিশ্রাম, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মঘণ্টার নিয়ম মানা এবং অতিরিক্ত সময়ের কাজের পারিশ্রমিক দেওয়ার বিষয়টি নিয়মিত তদারক করা দরকার। কাজের চাপ যেন মানুষের সহনশীলতার সীমা অতিক্রম না করে, সে দায়িত্ব নিয়োগকর্তারও রয়েছে।

নিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমিকের মৌলিক অধিকার। কারখানা বা কর্মস্থলে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমনপথ, যন্ত্রপাতির সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী থাকা দরকার। কর্মস্থলের ধরন অনুযায়ী সুরক্ষাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। এসব ব্যবস্থা শুধু পরিদর্শনের দিন দেখানোর জন্য নয়,  প্রতিদিন কার্যকর রাখতে হবে। নিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকলেও শ্রমিকেরা তা জানেন না বা জরুরি অবস্থায় কী করবেন তা শেখানো হয়নি এমন হলে পরিকল্পনাটি যথেষ্ট নয়। তাই প্রশিক্ষণ, মহড়া এবং নিয়মিত পরিদর্শনকে কর্মস্থলের স্বাভাবিক ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।

শ্রমিকের কল্যাণে চিকিৎসাসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও প্রয়োজন। কর্মস্থলে প্রাথমিক চিকিৎসা, দুর্ঘটনায় দ্রুত সহায়তা, অসুস্থতার ছুটি এবং কর্মক্ষেত্রে আহত হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, নিরাপদ যাতায়াত এবং শিশুকে দুধ পান করানোর উপযোগী পরিবেশের সুযোগ জরুরি। কর্মস্থলে যৌন হয়রানি বা বৈষম্যের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও গোপনীয় ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগকারী যেন প্রতিশোধ, অপমান বা চাকরি হারানোর শঙ্কায় নীরব থাকতে বাধ্য না হন।

শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় তাঁদের কথা বলার সুযোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠিতভাবে দাবি জানানো, প্রতিনিধি নির্বাচন, আলোচনা করা এবং অভিযোগ জানানো শ্রমিকের ন্যায্য অংশগ্রহণের পথ। এসব ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হলে ছোট সমস্যা জমে বড় বিরোধে রূপ নিতে পারে। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার কাঠামো থাকলে মজুরি, কর্মপরিবেশ, ছুটি বা নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধ দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধান করা সম্ভব। আলোচনাকে দোষারোপ বা সংঘাতের বদলে সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে দেখতে হবে।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায়  সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শ্রম আইন ও বিধিমালা কার্যকরভাবে প্রয়োগ, নিয়মিত পরিদর্শন, অভিযোগ তদন্ত এবং আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পরিদর্শন শুধু কাগজপত্র যাচাইয়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, কর্মস্থলে শ্রমিকের বাস্তব অবস্থা বুঝতে হবে। পরিদর্শনের ফল, চিহ্নিত অনিয়ম ও সংশোধনের সময়সীমা নথিভুক্ত করা উচিত। একই সঙ্গে শ্রমিকের অভিযোগ জানানোর সহজ পথ, নিরপেক্ষ শুনানি এবং দ্রুত প্রতিকার থাকা দরকার। মালিকপক্ষেরও দায়িত্ব আছে আইন মেনে চলা, কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা এবং নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা।

শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করাকে শিল্প বা ব্যবসার স্বার্থের বিপরীতে দাঁড় করানো ঠিক নয়। ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন, নিরাপদ কর্মস্থল এবং সম্মানজনক আচরণ শ্রমিকের মনোবল ও কাজে স্থিতিশীলতা বাড়ায়। অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা কমলে কর্মস্থলে আস্থা তৈরি হয়, বিরোধও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ পায়। দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ ও সুস্থ কর্মী, নির্ভরযোগ্য উৎপাদন এবং ভালো কর্মপরিবেশ শিল্পের জন্যও উপকারী। তবে এই সুফল পেতে অধিকার বাস্তবায়নকে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল হিসেবে নয়, ন্যায়বিচার ও মানবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে।

শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব এক পক্ষের নয়। সরকারকে আইন প্রয়োগ ও তদারকি করতে হবে, মালিকপক্ষকে ন্যায্য আচরণ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, আর শ্রমিকদের প্রতিনিধিদেরও তথ্যভিত্তিক ও আলোচনামুখী ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের পরিবার ও সমাজের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো দরকার। সমস্যা দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই ঝুঁকি শনাক্ত করা, নিয়মিত পর্যালোচনা করা এবং শ্রমিকের মতামত শোনা বেশি কার্যকর।

শ্রমিকের শ্রমে উৎপাদন চলে, আর উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত থাকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি। সেই শ্রমিক যদি ন্যায্য মজুরি না পান, নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন বা নিজের কথা বলার সুযোগ না পান, তবে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছায় না। তাই শ্রমিকের অধিকারকে দয়া বা অনুগ্রহ হিসেবে নয়, ন্যায্য পাওনা হিসেবে স্বীকার করতে হবে। অধিকার কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মস্থলে কার্যকর করা, শ্রমিকের কল্যাণকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখা এবং অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি। তাই শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

 

পরিচিতি:

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি

যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি

ফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮, ০১৮৪২৬৩১১১৮

E-mail: lionganibabul@gmail.com

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews