
শতভাগ পাসের হার দেখানোর প্রতিযোগিতায় বলি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ!

মুহাম্মদ শহিদুজ্জামান রনি
প্রতিবছর টেস্ট পরীক্ষার নামে বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে। দেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই কমবেশি এই চিত্র দেখা যায়। সারাদেশের মতো আমাদের মেঘনাতেও এর ব্যতিক্রম ঘটছে না। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবছর নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হার শতভাগ দেখানোর লক্ষ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিকল্পিতভাবে টেস্ট পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থীকে অকৃতকার্য দেখান। পরবর্তীতে যাচাই-বাছাইয়ের নামে শুধু ভালো ফলাফল করতে সক্ষম শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত করে মূল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সুনাম, ভালো ফলাফল এবং শতভাগ পাসের পরিসংখ্যান ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে বলি দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হার শতভাগ দেখানোর জন্য কেন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হবে? আমার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—টেস্ট পরীক্ষার পর থেকে ফাইনাল পরীক্ষা পর্যন্ত যে সময়টুকু পাওয়া যায়, সেই সময়টুকু কি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার কাজে লাগানো সম্ভব নয়? আমার বিশ্বাস, শিক্ষকদের আন্তরিক ইচ্ছা, দায়িত্বশীলতা ও একটু বাড়তি প্রচেষ্টা থাকলে এই সময়ের মধ্যে অনেক দুর্বল শিক্ষার্থীকে নতুন করে প্রস্তুত করা সম্ভব।
বিশেষ ক্লাস, অতিরিক্ত পাঠদান, নিয়মিত অনুশীলন এবং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থীর ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। ফলে টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া অনেক শিক্ষার্থীরও ফাইনাল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে পাস করার যথেষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তাহলে কেন সেই সুযোগটি দেওয়া হবে না? কেন একজন শিক্ষার্থীকে আরও একটি সুযোগ না দিয়ে তার শিক্ষাজীবনের পথ বন্ধ করে দেওয়া হবে? একজন শিক্ষক যদি চান, তাহলে তিনি শুধু ভালো শিক্ষার্থীদের নয়, বরং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদেরও সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
কখনো কি আমরা ভেবে দেখেছি, যেসব শিক্ষার্থীকে টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে মূল পরীক্ষা থেকে দূরে রাখা হয়, তাদের পরবর্তী জীবন কীভাবে কাটে? একবার কোনো শিক্ষার্থীকে অকৃতকার্য ঘোষণা করে শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে দেওয়া হলে অনেক সময় তার আত্মবিশ্বাস ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সে শিক্ষার জগৎ থেকে দূরে সরে পড়ে। কেউ জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ে। মেয়েদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অল্প বয়সেই বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। আবার ছেলেদের ক্ষেত্রে ‘লেখাপড়া করে আর কী হবে’—এমন নেতিবাচক ধারণা থেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে একটি শিক্ষার্থীর শুধু শিক্ষাজীবনই থেমে যায় না, থেমে যায় তার স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার পথও।
আমার প্রশ্ন, যে শিক্ষার্থীটি হয়তো একটু বেশি সুযোগ, সহযোগিতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে ভালো ফলাফল করতে পারত, তাকে সেই সুযোগ না দিয়ে ঝরে পড়ার পথে ঠেলে দেওয়ার দায় কে নেবে? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, শুধু বিদ্যালয়ের পাসের হার শতভাগ দেখানোর জন্য কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট করা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং কোনোভাবেই কাম্য নয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য শুধু শতভাগ পাসের পরিসংখ্যানে নয়; বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষিত, যোগ্য ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত।
আমরা চাই না, কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফলাফলের কারণে হতাশ হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিক। আমরা চাই, দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে তাদের আরও বেশি সহযোগিতা করা হোক। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্লাস, বিশেষ পাঠদান ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পরীক্ষার উপযোগী করে গড়ে তোলা হোক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পাশাপাশি মেঘনার এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সচেতন অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি—বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুন এবং এর একটি সুষ্ঠু ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসুন।
আমাদের দাবি—
১. টেস্ট পরীক্ষার নামে অযৌক্তিকভাবে শিক্ষার্থীদের মূল পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত করা বন্ধ করতে হবে।
২. টেস্ট পরীক্ষার পর ফাইনাল পরীক্ষার আগ পর্যন্ত সময়টুকু দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার কাজে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে।
৩. দুর্বল শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. বিদ্যালয়ের শতভাগ পাসের হার দেখানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে।
৫. কোনো শিক্ষার্থীকে পিছিয়ে না রেখে প্রত্যেকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৬. এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবশেষে বলতে চাই—
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে নয়, বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়েই অর্জিত হওয়া উচিত। আমরা শতভাগ পাসের হার দেখানোর প্রতিযোগিতা চাই না; আমরা চাই শতভাগ শিক্ষার্থী শিক্ষার আওতায় থাকুক। একটি সার্টিফিকেটের ফলাফল দিয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য পরিমাপ করা যায়, কিন্তু একটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে সেই সাফল্য অর্জন করা যায় না। আসুন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে সবাই সোচ্চার হই।
একটি সুন্দর, সুশিক্ষিত, মানবিক ও আলোকিত সমাজ গঠনে ঐক্যবদ্ধ হই। শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে নয়, শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলেই হোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য। আপনাদের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করছি।
লেখক
সাংবাদিক ও কলামিষ্ট,মেঘনা, কুমিল্লা