
প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে সোনালী আঁশের জৌলুস: জয়পুরহাটে পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা !
আবু রায়হান, জয়পুরহাট :
এক সময় দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল সোনালী আঁশ পাট। কিন্তু সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য প্লাস্টিক পণ্যের অবাধ ব্যবহার ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন হারিয়ে যাচ্ছে সেই ঐতিহ্য। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, পর্যাপ্ত জলাশয় ও পানি না থাকায় পাট জাগ দেওয়া বা পচানোর সমস্যা, পাটভিত্তিক শিল্প-কারখানা সংকোচনসহ নানা কারণে জয়পুরহাটে প্রতিবছরই কমছে পাটের আবাদ। কৃষকদের দাবি, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আরও সংকটে পড়বে পরিবেশবান্ধব এই অর্থকরী ফসল। সোনালী আঁশের হারানো সুদিন ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চান তারা। আর নানা রকম সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জয়পুরহাট জেলায় ২৪৩৭ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হচ্ছে। এক সময় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে শোভা পেত দেশের প্রধাণ অর্থকারি সোনালী আঁশ পাট। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই পাট চাষেই হাসি ফুটত জয়পুরহাটের কৃষকদের মুখে। কিন্তু কালের বিবর্তনে ও আধুনিকতার ছোয়ায় সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই মলিন। বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যের প্লাস্টিক পণ্যের আগ্রাসনে কৃষকেরা আগ্রহ হারাচ্ছেন পরিবেশ বান্ধব পাটের চাষে। স্থানীয় পাট চাষিদের অভিযোগ, প্লাস্টিক পণ্যে সহজ লভ্য ও অবাধ ব্যবহারে এবং পাটের তৈরি পণ্যের চাহিদা কম, পাট চাষের পর পচানোর জন্য পর্যাপ্ত জলাশয় ও পানি না থাকায় পাট জাগ দেওয়া বা পচানোর নানা সমস্যা। এছাড়াও সার, বীজ ও শ্রমিকের মজুরী সহ পাটের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। সেই তুলনায় মিলছে না ন্যায্যমূল্য। ফলে প্রতি বছরই লোকসানের বোঝা টানতে গিয়ে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্য ফসল চাষে ঝুকছেন। জয়পুরহাট সদর উপজেলার নারায়ন পাড়া, শুক্তাহার, তেঘর বিশা, জামালপুর চারমাথার আব্দুর রাজ্জাক, ফিরোজা বেগম, আমিনুর রহমান, বেলাল হোসেন, মজনু রহমান সহ বিভিন্ন এলাকার কৃষক দৈনিক ভোরের আওয়াজকে বলেন, পাটের নায্য মূল্য আমরা পাচ্ছিনা।

দিন দিন জলাশয় ভরাট হওয়া, পুকুরগুলোতে বানিজ্যিকভাবে মাছ চাষের কারণে পর্যাপ্ত জলাশয় ও পানি না থাকায় পাট জাগ দেওয়া বা পচানোর অনেক সমস্যা। আর শাখ সবজি, সরিষা, কলা, পেয়াঁজ-রসুন, ভুট্টা, আলু, বেগুণ, পটল, করলা, শসা সহ অন্যান্য ফসল কম সময়ে চাষ করা যায় এবং ছোট-বড় যেকোন হাটবাজারে বিক্রি করে নগদ অর্থ পাওয়া যায়। এছাড়াও সার, বীজ, শ্রমিক সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু পাট বিক্রি করে সেই খরচ ওঠে না। পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় বছরের পর বছর লোকসান গুনতে হচ্ছে। আর পাট চাষে সময় বেশি লাগে এবং বেচা-কেনার সমস্যসা, কমদামে প্লাষ্টিক পণ্য বাজারে সহজেই পাওয়া যায়। ফলে পাটের তৈরি বস্তা, দড়ি সহ অন্যান্য পণ্য কম চলে। এজন্য পাটের চাহিদাও কম। লোকশাণ ও বিভিন্ন সমস্যার কারণে পাট চাষ বাদ দিয়ে আমরা অন্য ফসল চাষ করছি। আর কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা কোন রকম পরামর্শ ও সহয়োগীতা পাইনা। নামমাত্র কোন কোন কুষকদের এক কেজি করে বীজ দিলেও সেই বীজের ভালো ফলন হয়না, তাই আমরা বাজার থেকে বীজ কিনে পাট চাষ করি। সরকার যদি পাটের উপর নজর দেয়, পাটের শিল্প-কারখানা গুলো চালু করে, পাট পচানোর সুবাব্যস্থা করলে আমরা অনেক কৃষকই আবার পাট চাষ করবো। আমাদের দাবি সরকার কৃষকদের সহযোগীতা করুক। জয়পুরহাট জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্ত মোঃ মেহেদী হাসান দৈনিক ভোরের আওয়াজকে
বলেন, বর্তমানে দেখছি পাটজাত পণ্যের ব্যবহার কম হচ্ছে।

বিপরিতে সাধারণ জনগণ প্লাষ্টিক পণ্য বেশি ব্যবহার করে থাকে। এর কারণ হিসেবে আমরা যেটা অনুসন্ধান করে পেয়েছি, দামে একটা পার্থক্য রয়েছে একারণে প্লাষ্টিক পণ্য ব্যবহারে আগ্রহ বেশি প্রকাশ পেয়ে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাটের উৎপাদন কম দেখা যায়। পাটের উৎপাদনকে বাড়ানোর জন্য এবং পাটের ব্যবহারকে বৃদ্ধি করার জন্য সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার প্লাষ্টিক পণ্য ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করেছে এবং এ বিষয়ে প্রশাসন সহ বিভিন্ন দপ্তর কাজ করছে। জনগণের বিভরে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে এবং পাটজাত পণ্য ব্যবহার বাড়ানো হলে, পাটরে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের পরিবেশও রক্ষা পাবে। পাশাপাশি বিপনন ব্যবস্থা উন্নত হবে। সাদিয়া সুলতানা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ী, জয়পুরহাট জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) সাদিয়া সুলতানা দৈনিক ভোরের আওয়াজকে বলেন, জয়পুরহাট জেলায় ২ হাজার ৪৩৭ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। পাটের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দিনদিন কমে যাওয়ার কারনে কৃষকদের মাঝে উৎপাদনের প্রভাবটা কম পরছে, কিন্ত ইদানিং সরকারের বিভিন্ন কর্যকরি ভুমিকা নেওয়ার করণে, আমাদের সম্বলিত প্রচেষ্টায় পাট চাষ আরও বৃদ্ধি পাবে। আমরা রিবনরেটিং পদ্ধতির বিষয়েও কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। পাট চাষের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে পূর্বের মত দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুড়াতে সরকার কর্যকরি পদক্ষেপ নেবেন এমনই আশা এখানকার কৃষকদের।