কক্সবাজার – চট্টগ্রাম সড়কে ৭১ দূর্ঘটনায় ৭২ মৃত্যু, কবে মিলবে ৬ লেন !
মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ আমিন,কক্সবাজার :
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ধারাবাহিক দুর্ঘটনায় বাড়ছে প্রাণহানি ও পঙ্গুত্বের ঘটনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, যানবাহনের তুলনায় সড়কটি অপর্যাপ্ত হওয়ায় চার বা ছয় লেনে উন্নীতকরণ, নিরাপত্তা ডিভাইডার স্থাপন এবং তিন চাকার যান নিয়ন্ত্রণ জরুরি। বিআরটিএর তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে ৭১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭২ জন, আহত ৭৮ জন। এদিকে, দুর্ঘটনা কমাতে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের পাশাপাশি বিকল্প আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ করছে সরকার। বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আসেন চকরিয়া পৌরসভার ৮নং ওর্য়াডের মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা আব্দুছ ছালাম (৫৫)। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম—কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার ডুলহাজারায় ট্রাকচাপায় মারাত্মকভাবে আহত হন। তিনি বর্তমানে জীবন বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। দুর্ঘটনায় তার দুই পা ভেঙে যায়, পায়ের রগ ছিঁড়ে যায়, কাঁধ ও হাত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুটি আঙুল নষ্ট হয়। স্বাভাবিক চলাফেরা এখন তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছ। দুর্ঘটনায় আহত আব্দুছ সালাম (৫৫) মনে করেন, চট্টগ্রাম—কক্সবাজার সড়কের সংকীর্ণতাই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, সড়কটি যদি আরও প্রশস্ত হতো এবং পৃথক লেনের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো তিনি এই দুর্ঘটনার শিকার হতেন না। শুধু আব্দুছ সালাম নন—চট্টগ্রাম—কক্সবাজার মহাসড়কে গত ছয় মাসে ৭২ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের স্বজনদের মতে, সড়কটির সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। দুর্ঘটনায় ভাই হারানো কক্সবাজার সদর খুরুশকুল এলাকার বাসিন্দা জানে আলম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার হিসেবে সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন, এজন্য তিনি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কক্সবাজার—চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। সরকার ইতোমধ্যে সড়কটি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনসাধারণের দীর্ঘদিনের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মহাসড়কটির উন্নয়নকাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। জানে আলম আরও বলেন, সড়কটি প্রশস্ত ও নিরাপদ করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে, যান চলাচল আরও সহজ হবে এবং মানুষের দুর্ভোগও অনেকাংশে লাঘব হবে। তাই তিনি মহাসড়কের উন্নয়নকাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সন্তানের বাবা কক্সবাজার শহরের সাহিত্যিকা পল্লী এলাকার কামাল আরমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর ছেলে গুরুতর আহত হয়ে একটি পা হারিয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকে তাঁর ছেলে শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন সময় পার করছে। তিনি বলেন, কক্সবাজার—চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং কক্সবাজার—টেকনাফ সড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা এখন অত্যন্ত জরুরি। তার মতে, বর্তমান সড়কের সক্ষমতার তুলনায় যানবাহনের চাপ অনেক বেশি হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। কামাল আরমান বলেন, সরকার ট্রাফিক বিভাগ ও বিভিন্ন সংস্থা সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে সড়কগুলোকে পর্যাপ্ত প্রশস্ত ও আধুনিক করা না হলে দুর্ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।’ তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার—চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার—টেকনাফ সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা হলে যান চলাচল আরও নিরাপদ হবে এবং দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এদিকে, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩৮টি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে বিআরটিএ। বুধবার দুপুরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের হল রুমে এসব পরিবারে মোট ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার চেক বিতরণ করা হয়। এসময় পরিবহন মালিকরা বলেন, কক্সবাজার—চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা শুধু তাদের নয়, স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদেরও দীর্ঘদিনের দাবি। কক্সবাজার জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক এস্তাফিজুর রহমান সময় সংবাদকে বলেন, কক্সবাজার—চট্টগ্রাম মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। তার মতে, যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচলের উপযোগী সড়ক না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়। তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, জনসচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রী ও পথচারীরা যদি সড়ক ব্যবহারে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন না করেন, তাহলে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা বেড়ে যায়। এস্তাফিজুর রহমান জানান, দীর্ঘদিনের দাবীর পর কক্সবাজার—চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার বা ছয় লেনে উন্নীত করার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। সড়কটি প্রশস্ত করা হলে বর্তমানের অনেক সমস্যা দূর হবে এবং যানবাহন চলাচল আরও নিরাপদ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত ও অন্যান্য তিন চাকার যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব যানবাহনের অনেক চালকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে ধারণা না থাকায় তারা হঠাৎ করে সড়কের মাঝখানে থেমে যান বা দিক পরিবর্তন করেন। ফলে পেছন থেকে আসা বাস ও ট্রাকের মতো ভারী যানবাহনের চালকদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং দুর্ঘটনা ঘটে। তার মতে, মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহনের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এসব যানবাহনকে বিকল্প বা ফিডার সড়কে পরিচালিত করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। কক্সবাজার বাস—মিনিবাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক বলেন, কক্সবাজার—চট্টগ্রাম মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে দ্রুত সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন। তার মতে, বর্তমান সড়কে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটছে, যা প্রাণহানির অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার পাশাপাশি মাঝখানে নিরাপত্তা ডিভাইডার স্থাপন করা জরুরি। ডিভাইডার না থাকলে বিপরীতমুখী যানবাহনের সংঘর্ষের ঝুঁকি থেকেই যায়, ফলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা কমানো কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার—চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার দাবি শুধু পরিবহন মালিকদের নয়, এটি স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদেরও দীর্ঘদিনের দাবি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সড়কটির সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন বাস্তবায়িত হলে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে। এদিকে বিআরটিএ কতৃর্পক্ষ এবং জেলা প্রশাসন বলছে, দুর্ঘটনা কমাতে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের পাশাপাশি বিকল্প আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ করছে সরকার। বিআরটিএ কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, কক্সবাজার—চট্টগ্রাম মহাসড়কে সারা দেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। তবে যানবাহনের চাপের তুলনায় সড়কটি তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ। একই সঙ্গে মোটরচালিত ও অযান্ত্রিক যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করায় প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। তিনি জানান, গত ছয় মাসে এই মহাসড়কে ৭১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৭২ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তায় বিআরটিএ বিভিন্ন সময়ে আর্থিক অনুদান প্রদান করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর আগে ৫৬টি পরিবারকে মোট ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আজ আরও ৩৮টি পরিবারকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিআরটিএ নানা ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলেও জানান তিনি। এ লক্ষ্যে পরিবহন মালিক, চালক ও যাত্রীদের মধ্যে নিয়মিত লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন বাস টার্মিনালে গিয়ে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে এবং পথচারীদের জন্যও বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিআরটিএ নিয়মিত রোড শো আয়োজন করছে এবং চালকদের দক্ষতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি মাসে রিফ্রেশার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। পাশাপাশি দূরপাল্লার যানবাহনের চালক ও শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন টার্মিনালে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চালক, যাত্রী ও পথচারী—সবার সম্মিলিত সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো মহাসড়কের পাশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যাত্রী ওঠানামা করানো। উপজেলা পর্যায়সহ বিভিন্ন স্থানে টমটম, অটোরিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহন অনেক সময় মহাসড়কের ওপরই হঠাৎ থেমে যায়। কক্সবাজার—চট্টগ্রাম মহাসড়ক একটি দ্রুতগতির সড়ক হওয়ায় পেছন থেকে আসা যানবাহনের চালকদের তাৎক্ষণিকভাবে ব্রেক করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ছোট যানবাহনের চালকেরা রাস্তার পাশে নেমে যাত্রী ওঠানো বা নামানোর প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেন না, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি বলেন, সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে সড়ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে চকরিয়া থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অংশে প্রয়োজনীয় সড়ক নিরাপত্তা চিহ্ন স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকারের নেওয়া এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। জেলা প্রশাসক আরও জানান, সরকারের উদ্যোগে একটি বিকল্প আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা আনোয়ারা থেকে টইটং পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই সড়ক পুরোপুরি চালু হলে অনেক যানবাহন বিকল্প পথে চলাচল করবে, ফলে কক্সবাজার—চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর চাপ কমবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, চলমান উন্নয়ন প্রকল্প ও নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার জেলায় সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।