
গভীর রাতে অসহায় কিশোরীকে নিয়ে বিপাকে স্থানীয় যুবকেরা, থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন !
রাত তখন প্রায় ১১টা। রাতের নিস্তব্ধ নামতে শুরু করেছে। এমন সময় ঢাকা বগুড়া মহাসড়কে শেরপুর বাস্ট্যান্ড এলাকায় রাস্তার পাশের একটি দোকানের বারান্দায় একা বসে থাকতে দেখা যায় ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীকে। পথচারীরা বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও স্থানীয় কয়েকজন যুবক মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে যান তার কাছে। ঘটনাটি ঘটেছে ২০ মে (বুধবার) রাত ১১টার সময়।
যুবকেরা মেয়েটির সাথে কথা বলে তারা জানতে পারেন, কিশোরীর নাম জান্নাতি খাতুন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মা-বাবার বিচ্ছেদের পর বাবা ঢাকায় নতুন সংসার গড়েছেন। অন্যদিকে মাও অন্যত্র বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। ফলে কোথাও তার স্থায়ী আশ্রয় হয়নি। কখনো খালার বাড়ি, কখনো মামার বাড়িতে থাকতে হলেও নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে সে। অসহায় কিশোরীর এমন পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় জাফর, মুজাহিদ, তনু, সাব্বির ও সবুজ সহ কয়েকজন যুবক তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিতে শরণাপন্ন হন শেরপুর থানা পুলিশের। কিন্তু সেখানে গিয়ে সহযোগিতার বদলে অসহযোগিতামূলক আচরণের মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। যুবকদের দাবি, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দিন মেয়েটিকে থানায় রাখতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তাদের আত্মীয়স্বজনের খোঁজ তাদের নিজ দায়িত্বে নিতে বলেন এবং মেয়েটিকে থানায় রাখা সম্ভব নয় বলে জানান। না পারলে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যেতে বলা হয় তাদের। এতে বিপাকে পড়ে যান মানবিক দায়িত্ব পালন করতে আসা ওই যুবকেরা। গভীর রাত পর্যন্ত তারা কিশোরীটিকে নিয়ে থানার চত্বরে অপেক্ষা করেন। পরে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমুকে (ইউএনও) মুঠোফোনে জানানো হয়। তারপরও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি থানা পুলিশ—এমন অভিযোগও তাদের।
অবশেষে বাধ্য হয়ে স্থানীয় ওই যুবকেরা কিশোরীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার স্বজনদের খোঁজ শুরু করেন। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর গভীর রাতে শাহবন্দেগী ইউনিয়নের দহপাড়া গ্রামে তার মামার বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। পরে মামা ও নানার সঙ্গে কথা বলে কিশোরীর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। তবে ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর শেরপুর উপজেলা শাখার সভাপতি নিমাই ঘোষ বলেন, বিপদে পড়লে মানুষ প্রথমেই থানার দ্বারস্থ হয়, এটা তো তাদের দায়িত্ব নিয়ে সহযোগিতা করার কথা। সেখানে সহযোগিতার বদলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেলে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে মানবিক কাজে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
অভিযোগের বিষয়ে শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দিন বলেন, “মানবিকতা দেখাতে গিয়ে আমি তো আইনের বাইরে কাজ করতে পারি না। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনা আছে, কোনো প্রতিবন্ধী বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে থানায় রাখা যাবে না। তাই আমরা তাদের আত্মীয়স্বজনের খোঁজ করার পরামর্শ দিয়েছি, অথবা নিজেদের হেফাজতে রাখতে বলেছি।” এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে আমিও মানবিক দিক বিবেচনায় থানা হেফাজতে রাখতে ওসিকে অনুরোধ করেছিলাম। তবে পরবর্তীতে মেয়েটিকে থানা হেফাজতে রাখা হয়নি বলে জানতে পেরেছি।