
বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের একটি প্রশংসনীয় মানবিক উদ্যোগ এখন স্থানীয় রাজনৈতিক বিতর্ক ও ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্রের জাঁতাকলে পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সহায়তায় ঘর নির্মাণ ও চিকিৎসার অনুদান পাওয়ার পর ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের ঐ নারীর স্বামীর বক্তব্যে স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে টাকা ফেরত ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যদিও ভুক্তভোগী নারী নিজেই পরে স্বামীর বক্তব্যকে ‘মিথ্যা প্রলোভনপ্রসূত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় ৫ই নভেম্বর। স্থানীয় একটি ফেসবুক পেজে ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের উত্তর কামালপুর গ্রামের মোছাঃ পারভিন বেগমের দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে চিকিৎসা বন্ধ এবং তিন সন্তান নিয়ে তাঁর অসহায়ত্বের খবর প্রচারিত হয়। সংবাদটি বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ জহুরুল হুসেনের দৃষ্টিগোচর হয়।
মানবিক সাড়া দিয়ে ইউএনও ১০ নভেম্বর পারভীনের বাড়িতে যান এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা ও পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি পারভীনের চিকিৎসার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, সন্তানদের শিক্ষা ও ভরণপোষণের আশ্বাস দেন এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি নতুন ঘর নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৩ই নভেম্বর, পারভিন ও তার স্বামীকে উপজেলা অফিসে নিয়ে এসে ঘর নির্মাণে সহায়তার জন্য নগদ ১০ হাজার টাকা এবং টিন প্রদান করা হয়। প্রশাসনের এই উদ্যোগ যখন ইতিবাচক আলোচনার কেন্দ্রে, তখনই নাটকীয় মোড় নেয় পরিস্থিতি। পারভীনের স্বামী সফি আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, কামালপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাপ জামাল অনুদানের নগদ ১০ হাজার টাকা ফেরত নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, চেয়ারম্যান তাঁর কাছ থেকে অতিরিক্ত আরও ২০ হাজার টাকা আদায় করেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
এই অভিযোগের পরপরই স্থানীয় মহলে প্রশ্ন ওঠে: চরম আর্থিক অসচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও পারভীনের স্বামী এত বিপুল পরিমাণ অর্থাৎ ২০ হাজার টাকা কোথা থেকে পেলেন? এবং চেয়ারম্যান কীভাবে সেই টাকা আদায় করলেন? অভিযোগটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পাল্টাপাল্টি দুটি ভিডিও ভাইরাল হয়। প্রথম ভিডিওতে দেখা যায়, একটি স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীরা সফি আলমকে সামনে রেখে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বক্তব্য রেকর্ড করছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় দ্বিতীয় ভিডিওতে পারভিন বেগমকে দেখা যায়, যেখানে তিনি স্পষ্টত স্বামীর অভিযোগকে অস্বীকার করেন। পারভিন দাবি করেন, ‘মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে’ তাঁর স্বামী চেয়ারম্যানের নামে ভুল বক্তব্য দিয়েছেন।
এলাকাবাসীর বক্তব্যে জানা যায়, অভিযোগকারী স্বামী সফি আলম একজন নেশায় আসক্ত এবং জুয়া খেলায় অভ্যস্ত ব্যক্তি। স্থানীয়দের ধারণা, সফি আলমের এই হঠাৎ অভিযোগ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা ষড়যন্ত্র, যা হয়তো ব্যক্তিগত কোনো দ্বন্দ্ব বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। যদিও অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সফি আলমকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাপ জামাল তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ ‘মিথ্যা এবং বানোয়াট’ বলে দাবি করে বলেন, “আমাকে মিথ্যা ষড়যন্ত্রে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। আমি কোনো টাকা নিইনি।”
এদিকে, প্রশাসনের উদ্যোগে পারভীনের জন্য ঘর নির্মাণ এবং অন্যান্য অনুদান বিতরণের কাজ এখনও চলমান ও দৃশ্যমান। এই পরিস্থিতিতে, স্বামীর অভিযোগের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়ায় এবং স্ত্রীর পাল্টা বক্তব্যের পর সমাজে প্রশ্ন জাগছে—এটি কি প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করার একটি ব্যক্তিগত চক্রান্ত, নাকি এর নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক অপব্যবহার লুকিয়ে আছে? এ বিষয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ঘটনাটির বিষয়ে আমি অবগত আছি, যেহেতু কাজটি দৃশ্যমান, তাই চেয়ারম্যান কে জানিয়ে দিয়েছি মেয়েটির সাহায্যর ব্যাপারটা চলমান থাকবে।