
হাতে নয়, পা দিয়ে লিখে বাজিমাত
অদম্য মানিকের স্বপ্ন এখন দেশের সেরা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া
আব্দুস সালাম, দিনাজপুর
দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগে ভর্তি হয়ে সাফল্য ও অনুপ্রেরণার নতুন গল্প লিখছেন অদম্য তরুণ মানিক রহমান। পিইসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি সবকটি পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। পা দিয়ে লেখার অসাধারণ ক্ষমতা আর একাগ্রতা নিয়ে জীবনের সব বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে চলেছেন এই মেধাবী শিক্ষার্থী।
চোখে আঙুল দিয়ে মানিক প্রমাণ করে দিয়েছেন, ইচ্ছা ও সঠিক সমর্থন থাকলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সফলতার পথে কোনো বাধা হতে পারে না।
কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার চন্দ্রখানা গ্রামের ওষুধ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান ও সহকারী অধ্যাপক মরিয়ম বেগম দম্পতির বড় ছেলে মানিক। জন্ম থেকেই তার নেই দুটি হাত, দুই পায়ের একটিও তুলনামূলক এক ফুট ছোট। এমনকি শিশু বয়সে মুখ ও নাক আলাদা করতে হয়েছিল জটিল অস্ত্রোপচার করে।
শারীরিক এত বাধা যার জন্মলগ্ন থেকেই সঙ্গী, সেই মানিক কিন্তু কখনোই থেমে যাননি। মা-বাবাও সন্তানের হাল ছাড়েননি একটুও। মা মরিয়ম বেগম ছোটবেলা থেকেই মানিককে ডান পা দিয়ে লেখার চর্চা করান এবং জোগান অসীম সাহস। আর বাবা সব সময় ঢাল হয়ে পাশে থেকেছেন। মা-বাবার সেই লড়াই আর নিজের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে মানিক শুধু পড়াশোনাতেই নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অর্জন করেছেন অসাধারণ দক্ষতা। পা দিয়েই মোবাইল ব্যবহার ও কম্পিউটার টাইপিংয়ে সমান পারদর্শী তিনি।
হাবিপ্রবির ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মানিক অল্প সময়ের মধ্যেই নিজ বিভাগের সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। দুই হাত নেই, একটি পা অচল তবুও তার মুখে সব সময় লেগেই থাকে এক চিলতে অমলিন হাসি। মানিকের মার্জিত ব্যবহার ও প্রখর মেধার কারণে সহপাঠীরা কখনোই তাকে ভিন্নভাবে দেখেন না। পড়াশোনার পাশাপাশি গান গেয়েও মাঝে মাঝে আড্ডা জমিয়ে তোলেন এই তরুণ।
মানিকের বিভাগে শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, মানিক অত্যন্ত মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই যে মেধাকে আটকে রাখতে পারে না, তার জ্বলন্ত প্রমাণ মানিক। ওর বাবা-মায়ের চেষ্টা ও মানিকের দৃঢ় মনোবলই তাকে আজকের এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। তাকে দেখে অন্য শিক্ষার্থীরাও অনুপ্রেরণা পাবে।
সব পরীক্ষার সাফল্যে পথচলা সহজ মনে হলেও জীবনের মোড়ে মোড়ে মানিককে নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার সময় দেশের এক নামজাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু শারীরিক অবস্থার কারণে তাকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। সেই চরম অপমান ও কষ্টে ভেঙে পড়লেও মা-বাবার দেওয়া সাহসে ফের ঘুরে দাঁড়ান তিনি।
সেই আক্ষেপ এখন আর মানিককে পেছনে টানতে পারে না। বরং জীবনের সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে এখন তার চোখ ভবিষ্যতের দিকে। মানিক জানান, তার একমাত্র স্বপ্ন তিনি দেশের সেরা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের একজন হবেন এবং মেধা দিয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করবেন।
প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ় মনোবল থাকলে স্বপ্ন ছোঁয়া যে অসম্ভব নয় মানিক রহমান আজ সেই অদম্যতার এক জীবন্ত উদাহরণ।