
পাহাড়ধস- বন্যায় ৩১ প্রাণহানি,মৎস্যে ৪৬ কোটি টাকার ক্ষতি !
মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ আমিন, কক্সবাজার :
কক্সবাজারে নামছে বন্যার পানি, ভেসে উঠছে ধ্বংসের ক্ষতচিহ্ন। টানা নয় দিনের ভারী বর্ষণের পর কক্সবাজারে উন্নতি হয়েছে বন্যা পরিস্থিতির। তবে পানি সরে যেতেই সামনে আসছে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র-বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-বেড়িবাঁধ, বিপর্যস্ত কৃষি ও মৎস্য খাত। দুর্যোগের পানি কমলেও এখন বড় চ্যালেঞ্জ বন্যার রেখে যাওয়া ক্ষত সারানো। তবে ত্রাণের পর এবার পুনর্বাসনে জোর, ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছে সরকার জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

কক্সবাজারের রামুর কালাখন্দকার পাড়ার রিকশাচালক মাহমুদুল হকের ঘরে এখনো বন্যার পানি। বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু কাটেনি দুর্ভোগ। কোমরসমান পানি পেরিয়ে তিনি দেখছেন ভেঙে পড়া বসতির ঘেরা-বেড়া আর নষ্ট হয়ে যাওয়া সংসারের শেষ সম্বল।
মাহমুদুল হকের দাবি, বন্যার পানিতে আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়সহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ এখনো মেলেনি কোনো সহায়তা।

গত ৪ জুলাই হইতে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধস ও সৃষ্ট বন্যায় কক্সবাজারে ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য নিরূপন করেছে জেলা প্রশাসন। যেখানে প্রাণহানি, বসতবাড়ি, মৎস্যখাত, কৃষি, সড়ক, বেড়িবাঁধে ভাঙনসহ ব্যাপক ক্ষতির চিত্র উন্মোচিত হয়। এরই মধ্যে সোমবার থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় প্লাবিত এলাকার পানি নামতে শুরু করে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা নয় দিনে কক্সবাজারে মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায় এবং অন্তত আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে পেকুয়া উপজেলার ৯৫ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। এরপর মাতামুহুরীতে ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ায় ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ায় ৬৫ শতাংশ এবং মহেশখালীতে ৫০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। অন্যদিকে রামু উপজেলার ৩৫ শতাংশ, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ২৫ শতাংশ করে এবং ঈদগাঁও উপজেলার ৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া একজন নিখোঁজ রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে উখিয়ায়। সেখানে পাহাড়ধসে ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিকসহ মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এরপর চকরিয়ায় ছয়জন নিহত এবং একজন নিখোঁজ হন। কক্সবাজার সদরে তিনজন, পেকুয়া ও রামুতে দুজন করে, এবং মাতামুহুরী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে নিহত হন।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য বলছে, নয় দিনের বৃষ্টি ও বন্যায় কক্সবাজারে মোট ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়ায়। উপজেলাটিতে ৪৫০টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য মিলেছে।
এরপর চকরিয়ায় ৩০০টি, কুতুবদিয়ায় ২৫০টি, মহেশখালীতে ২০০টি এবং মাতামুহুরীতে ১৯০টি, টেকনাফে ১০০টি, উখিয়ায় ৫০টি, ঈদগাঁওয়ে ৩০টি, রামুতে ২৫টি এবং কক্সবাজার সদর উপজেলায় ১৮টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ জানায় জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, মৎস্য খাতে প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় জেলার ১০ উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়গুলোর মোট আয়তন প্রায় ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর।
তিনি বলেন, এসব পুকুর ও ঘের থেকে ১ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩ কোটি ৫৬ লাখ মাছের পোনা এবং ২ কোটি ২১ লাখ চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি ৭৬৮টি পুকুর, ঘের ও খামারের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানবরজ ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজিসহ ৪ হাজার ২১১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক ক্ষতিগ্রস্ত জমির মধ্যে রয়েছে, চকরিয়ায় ১ হাজার ৬৬১ হেক্টর, কুতুবদিয়ায় ১ হাজার ১২০ হেক্টর, পেকুয়ায় ৫০০ হেক্টর, রামুতে ৩৪০ হেক্টর, মহেশখালীতে ২৩৭ হেক্টর, টেকনাফে ১৪০ হেক্টর, কক্সবাজার সদরে ৮৮ হেক্টর, ঈদগাঁওয়ে ৭৫ হেক্টর এবং উখিয়ায় ৫০ হেক্টর।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয় উপজেলায় মোট ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে চকরিয়ায় ১৩ হাজার ৮৫২ জন, পেকুয়ায় ৭ হাজার ২০ জন, কুতুবদিয়ায় ৬ হাজার ৪১৫ জন, রামুতে ৪ হাজার ৮৭৫ জন, মহেশখালীতে ৪ হাজার ৩২০ জন, টেকনাফে ৩ হাজার ১২০ জন, ঈদগাঁওয়ে ১ হাজার ৩০৪ জন, কক্সবাজার সদরে ১ হাজার ১৬৬ জন এবং উখিয়ায় ১ হাজার ১৩৮ জন কৃষক রয়েছেন।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, এটি প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে যাচাই শেষে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
৪৪টি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, পানি উন্নয়ন বিভাগ-১-এর আওতাধীন ৩৮০ দশমিক ২৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে টানা বৃষ্টিতে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ৪৪টি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে। বৃষ্টি কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভারী বর্ষণ ও বন্যায় কক্সবাজারে মোট ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চকরিয়ায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক এবং ২০টি সেতু-কালভার্ট, মাতামুহুরীতে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট, এবং পেকুয়ায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও দুটি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজার সদরে ২০ কিলোমিটার, রামুতে ৫০ কিলোমিটার, কুতুবদিয়ায় ৯ কিলোমিটার, উখিয়ায় ৬ কিলোমিটার, টেকনাফে ৫ কিলোমিটার এবং ঈদগাঁওয়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতু ও কালভার্টের মধ্যে টেকনাফে ১৫টি, উখিয়ায় ১২টি, রামুতে ৫টি, কক্সবাজার সদরে ৪টি, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় দুটি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
অপরদিকে টানা নয় দিনের ভারী বর্ষণ ও বন্যায় কক্সবাজারে মোট ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায়। এই দুই উপজেলায় ১৫টি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য উপজেলাগুলোতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির কোনো তথ্য জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।
জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আঃ মান্নান জানান, ৯ দিনে জেলার ৬১৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৫৮০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। প্লাবিত এলাকার মানুষদের ৭৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ২৯৮ মেট্টিক টন চাল ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ত্রাণের চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।