সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
পল্লী উন্নয়নে পুরুষের চেয়ে নারীদের অবদান বেশি-ফজলুল হক মিলন এমপি ! সোনারগাঁয়ে ‘ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির উদ্বোধন ! আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক দায়বদ্ধতা কনভেনশনে যোগদান বাংলাদেশের শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিটি ক্লাসরুমে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে: শিক্ষামন্ত্রী দিনাজপুর বোর্ডে ইংরেজি প্রথম পরীক্ষায় বহিষ্কার ৭, অনুপস্থিত ২৮৫২ ! জুলাই সনদকে অস্বীকার করে বিএনপি সরকার জনগণের সাথে প্রতারণা ! বাউফলে পালিত হচ্ছে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ !  বিশেষ ঘোষণা শরীয়তপুর-২ আসনের এমপি সফিকুর রহমান কিরণের উদ্যোগে ৭ ইমামের ওমরাহ পালন ! দিনাজপুরে ১ম জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উদযাপিত: ঋণ ও চারা বিতরণ !

অবৈধ পাইপে ভাঙছে ইছামতির বাঁধ !

  • প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

অবৈধ পাইপে ভাঙছে ইছামতির বাঁধ !

তরিকুল ইসলাম:

সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তঘেঁষা ইছামতি নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবেশের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর ধরে কিছু অসাধু ব্যক্তি ব্যক্তিস্বার্থে নদীর তীরবর্তী বেড়িবাঁধ কেটে কিংবা ফুটো করে অবৈধভাবে পাইপ বসিয়ে নদীর পানি ওঠানামার ব্যবস্থা করছে। সাময়িক আর্থিক লাভের আশায় তারা যে ক্ষতি করছে, তার মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে পুরো জনপদকে। কালিগঞ্জ উপজেলার শুইলপুর থেকে দেবহাটা উপজেলার ভাতশালাসহ ইছামতি নদীর বিভিন্ন অংশে বর্তমানে এমন অসংখ্য অবৈধ পাইপের অস্তিত্ব দেখা যায়। কোথাও বাঁধ কেটে, কোথাও আবার বাঁধের নিচ দিয়ে পাইপ বসিয়ে নদীর পানি মাছের ঘেরে বা চিংড়ি চাষে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাইরে থেকে বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভয়াবহ পরিবেশগত ও প্রকৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে। একটি বেড়িবাঁধ কেবল মাটির স্তূপ নয়; এটি একটি বৈজ্ঞানিক নকশায় নির্মিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পানি উন্নয়ন বোর্ড কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যে বাঁধ নির্মাণ করে, তার প্রতিটি স্তর নির্দিষ্ট প্রকৌশলগত মান অনুসরণ করে তৈরি করা হয়। সেই বাঁধের কোনো অংশ কেটে বা ফুটো করে পাইপ বসানো মানে পুরো কাঠামোকেই দুর্বল করে দেওয়া। বর্ষাকাল কিংবা পূর্ণ জোয়ারের সময় পানির তীব্র চাপ সবচেয়ে আগে আঘাত হানে এই দুর্বল অংশগুলোতে। ফলাফল—একসময় হঠাৎ করেই বাঁধ ভেঙে যায়, আর মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। প্রতিবছর সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলে, দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানায়, মানববন্ধন করে, সংবাদ সম্মেলন করে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনা হয়—এই বাঁধ দুর্বল হওয়ার পেছনে স্থানীয়ভাবেই কতটা অবহেলা বা অবৈধ কর্মকাণ্ড দায়ী ছিল। বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই যেসব বাঁধ পরে ভেঙে যায়, সেগুলোর গায়ে আগেই অসংখ্য অবৈধ পাইপ বসানো হয়েছিল। ব্যক্তিগত ঘেরে পানি ওঠানোর সুবিধার জন্য বাঁধের স্থায়িত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়। পরে যখন দুর্যোগ আসে, তখন ক্ষতির বোঝা বহন করে পুরো সমাজ এবং রাষ্ট্র। এর আরেকটি ভয়াবহ প্রভাব পড়ে কৃষিতে। লবণাক্ত নদীর পানি যখন বাঁধ ভেঙে ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ে, তখন শুধু একটি মৌসুম নয়, বহু বছর ধরে সেই জমির উৎপাদনক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। ধান, পাট, শাকসবজি কিংবা অন্যান্য ফসল চাষ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কৃষক হারান তাঁর পুঁজি, শ্রম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। শুধু কৃষিই নয়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়। অপরিকল্পিতভাবে পাইপ বসানোর ফলে জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এতে নদীর তীর ক্ষয়, পলি জমার ধরন এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে একটি সুস্থ নদী ধীরে ধীরে পরিবেশগত ভারসাম্য হারাতে শুরু করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বৈধ নয়। সরকারি বেড়িবাঁধ কাটা, ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা অনুমতি ছাড়া নদী থেকে পানি উত্তোলনের জন্য বাঁধে পাইপ বসানো বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। তারপরও প্রকাশ্যে দিনের পর দিন এই কাজ চললেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি বা আইন প্রয়োগ চোখে পড়ে না। কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া, কোথাও প্রশাসনিক উদাসীনতা—সব মিলিয়ে অবৈধ কর্মকাণ্ড যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সর্বোপরি স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও নতুন করে বাঁধ কেটে পাইপ বসানো হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে অবৈধ পাইপ অপসারণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মাছ বা চিংড়ির ঘেরে পানি নেওয়ার প্রয়োজন থাকতেই পারে। কিন্তু তার জন্য নদীর বাঁধ ধ্বংস করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রকৌশলগতভাবে অনুমোদিত স্লুইসগেট, নিয়ন্ত্রিত খাল অথবা পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। নদী রক্ষা করেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো যায়—প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা। স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজ একজন ব্যক্তি নিজের সুবিধার জন্য বাঁধ কাটছেন, কিন্তু আগামীকাল সেই বাঁধ ভেঙে তাঁর নিজের ঘরবাড়ি, জমি কিংবা ব্যবসাও পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। তাই এটি শুধু প্রশাসনের বিষয় নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন। ইছামতি নদী আমাদের ঐতিহ্য, সীমান্তের নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নদী ও এর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষা করা মানে হাজারো মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। ব্যক্তিস্বার্থের কাছে জনস্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। আজ যদি আমরা অবৈধভাবে বাঁধ কাটাকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ ভেবে এড়িয়ে যাই, তাহলে আগামী দিনের ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন ও কৃষি বিপর্যয়ের দায় আমাদের সবাইকেই বহন করতে হবে। তাই এখনই সময়—অবৈধ পাইপ অপসারণ, বাঁধ কাটা বন্ধ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের। কারণ, বেড়িবাঁধ ভাঙে একদিনে; কিন্তু তার ক্ষত শুকাতে লেগে যায় বহু বছর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews