সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০৩:২২ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
দীঘিনালার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ১০৫ পরিবারের বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ! বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত ! আনোয়ার ইব্রাহিমের দেয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ! সাঘাটায় স্কুল কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে ছাত্রশিবির নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, আহত ১ ! বেমানান  ! ঐতিহ্যের নিদর্শন বারোবাজারের গলাকাটা মসজিদ, স্মৃতি বহন করছে প্রাচীন দিঘি ! নানা অনিয়মের অভিযোগে যুবদল নেতা খায়রুল ইসলাম সজীব বহিষ্কার।  মেঘনায় মাদক বিক্রির অভিযোগে যুবক আটক, আদালতে প্রেরণ ! সফলতার দৃষ্টান্ত: হিলিতে হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী মাহফুজার ! গোসল করতে গিয়ে পুকুরে ডুবে দুই বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু !

ঐতিহ্যের নিদর্শন বারোবাজারের গলাকাটা মসজিদ, স্মৃতি বহন করছে প্রাচীন দিঘি !

  • প্রকাশিত: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

ঐতিহ্যের নিদর্শন বারোবাজারের গলাকাটা মসজিদ, স্মৃতি বহন করছে প্রাচীন দিঘি !

জাহাঙ্গীর হোসেন, কালীগঞ্জ ঝিনাইদহ  :

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জর বারোবাজার  এখানে রয়েছে সুলতানি আমলের  ৮০০ বছরের পুরোনো অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের যে স্থানে বারোবাজার অবস্থিত, তার আশপাশে ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের বৃত্ত আঁকলে যে স্থানটি ধরা পড়ে, তার মধ্যেই রয়েছে অনেকগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এই নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে আজ থেকে ৫০০ বছর আগে এই অঞ্চলে একটি সমৃদ্ধ সুলতানি জনপদ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন শাসনামলে এই জনপদ ক্রমশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। গত শতকের আশির দশকে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বারোবাজার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন উঁচু উঁচু মাটির ঢিবি খনন করে এসব অত্যাশ্চর্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার করেন। আশপাশের জনপদ সমতল থাকলেও শুধু এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল। এই এলাকায় সুলতানি আমলের ১৯টি মসজিদ মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে গলাকাটা মসজিদ অন্যতম। ২১ ফুট লম্বা ও ১৮ ফুট চওড়া মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ১৯৯২-৯৩ সালে খনন করে। বারোবাজার ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘গলাকাটা মসজিদের মতো এ এলাকার অনেক মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে মাটির নিচে ছিল। স্থানটি ছিল উঁচু ঢিবি। এ ঢিবির ওপর জঙ্গল ও বড় বড় গাছপালা গজিয়ে উঠেছিল। সেগুলো পরিষ্কার করে অনন্য এই নিদর্শনগুলো বের করা হয়। খনন করার সময় শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে হুসাইনের আমলের (৮০০ হিজরি) আরবি ও ফার্সিতে লেখা কয়েকটা পাথর এখানে পাওয়া যায়। সেগুলো দেখে অনুমান করা হয়, মসজিদটি সুলতানি শাসনামলের তৈরি। একসময় এ জনপদে বাস করতেন প্রাচীন রাজারা।’গাছগাছালিতে ছেয়ে আছে আশপাশের পুরো এলাকা। ঘন গাছগাছালির ভেতর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দর মসজিদটি। মসজিদের ছাদে রয়েছে ছয়টি গম্বুজ। ভেতরে রয়েছে দুটি কষ্টিপাথরের মিনার। মসজিদটি খনন করার সময় একটি হাতে লেখা কোরআন শরিফ ও একটি তলোয়ার পাওয়া যায়। সেগুলো মসজিদের ভেতরেই সংরক্ষিত আছে। চারটি ৬ কোণাকৃতি বড় মোটা পিলারের ওপর মূল মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে। পিলারগুলো ২৫ ফুট করে লম্বা। মসজিদের দেয়াল ৫ ফুট চওড়া। সামনের দিকে ৩টি দরোজা রয়েছে। এছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণপার্শ্বে দুইটি করে প্রবেশপথ ছিল। এগুলো ইটের জাল করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি দরোজার উপরে রয়েছে সুচালো খিলান। ভিতরে পশ্চিমের দেয়ালে ৩টি মেহরাব আছে। এতে পোড়ামাটির কারুকাজ এবং ফুল, লতাপাতা, ঘণ্টা, চেইন ইত্যাদির নকশা করা আছে। কালো পাথরের ৮ ফুট উচ্চতার দুটো স্তম্ভ ছাদের সঙ্গে মিশে আছে। মসজিদের গম্বুজগুলো স্তম্ভের সামনে ও পেছনে স্থাপিত হয়েছে। এই মসজিদের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় দেশের বেশ কিছু মসজিদের । যেমন, গৌরের ধবীচক  মসজিদ,  বাবা আদমের মসজিদ, শৈলকুপার শাহি মসজিদ ও বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ। ইসলামি স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে গলাকাটা মসজিদ বাংলাদেশের পুরাকীর্তিকে সমৃদ্ধ করেছে। মসজিদের পাশে রয়েছে গলাকাটা দিঘি। খান জাহান আলি (রহ.)-এর সমসাময়িক এ দিঘি বলে প্রবল জনশ্রুতি আছে। এ দিঘিটি চর্তুদিকের পাড়সহ বারো বিঘা জমির ওপর অবস্থিত। দিঘির জলে হাঁসের ভেসে বেড়ানোর দৃশ্য খুবই চমৎকার। দিঘির শান্ত জল সুলতানি আমলের জৌঁলুস মনে করিয়ে দেয়। আগের দিনে বড় মসজিদ নির্মাণ করলে তার সামনে অজু-গোসলের জন্য এমন একটি দিঘি নির্মাণ করা হতো। তবে এই দিঘির নাম কেন গলাকাটা হলো , জনশ্রুতি আছে, বারোবাজারে একজন অত্যাচারী রাজা ছিলেন। তিনি প্রজাদের বলি দিয়ে এই দিঘির মধ্যে ফেলে দিতেন। এ কারণেই এর নাম হয় গলাকাটা দিঘি। আবার অনেকে মনে করেন, দিঘির ওপর দিয়ে রাতে গলাকাটা ঘোড়া চলত। তাই মানুষ এর নাম দিয়েছে গলাকাটা দিঘি। এর থেকে মসজিদেরও নাম হয় গলাকাটা মসজিদ। মসজিদের ভেতরের দেয়ালে রয়েছে বিভিন্ন প্রকার জ্যামিতিক ও ফুলের নকশা। তিনটি মেহরাবের প্রান্তভাগ আয়তক্ষেত্রাকৃতির ফ্রেম দ্বারা বাঁধানো। উত্তর ও দক্ষিণ পার্শ্বের মেহরাবের ক্ষেত্রাকৃতির ফ্রেমের মধ্যে পোড়া মাটির জ্যামিতিক নকশা রয়েছে। আয়ত ক্ষেত্রাকৃতির ফ্রেমের ওপরে আছে বন্ধ মার্শনের সারি। এলাকাবাসী জানায়, সংস্কার ও সংরক্ষণের আগে মসজিদের দেয়ালগুলো একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় অবস্থিত ছিল এবং এর কোন গম্বুজ ছিলনা। সম্প্রতি কয়েকটি গম্বুজসহ মসজিদটি পুর্ননির্মিত হয়েছে। গোলাকার ঢিবির ওপর স্থাপিত মসজিদটির উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালের প্রতিটিতে আছে দুটি করে জালিবিশিষ্ট জানালা। পূর্ব দেয়ালে রয়েছে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। মসজিদের ভেতরে ২.৯৮ মিটার ব্যবধানে দুটি বহুভুজাকার পাথরের স্তম্ভ রয়েছে। এর দেয়ালগুলো প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া। মাঝখানে আছে লম্বা দুটি কালো পাথর। মেহরাবের দুপাশের দেয়ালে উৎকীর্ণ হয়েছে পোড়া মাটির রেখাকৃতির বিভিন্ন ধরনের জ্যামিতিক ও ফুলের নকশা। এছাড়া মসজিদের দেয়াল ও ছাদজুড়ে আছে পোড়ামাটির ঘণ্টা ও চেইনের নকশা। মসজিদের সামনে নবনির্মিত একটি বারান্দা আছে। সাংবাদিক ও সমাজ সেবক শফি কামাল সবুজ বলেন, বারোবাজারে ইতিহাস বলে শেষ হবে না, আমি যশোর খুলনার ইতিহাস বইতে পড়েছিলাম বারোবাজার ঘেঁষে চলা বুড়ি ভৈরব নদীর পাড় দিয়ে নাকি বিমানবন্দর ছিল। বারোবাজারের অনেক ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়ে নয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক (খুলনা ও বরিশাল বিভাগ) মহিদুল ইসলাম, জানান ,বারোবাজারের মসজিদগুলো শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং ১৫–১৬ শতকের বাংলার জনবসতি, ইসলাম প্রচার, নগরায়ণ ও শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এসব স্থাপনায় পোড়ামাটির ইট, খিলান, গম্বুজ ও  নকশার সমন্বয় দেখা যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews