
“সত্যের জ্যোতির্ময় প্রকাশ: সৈয়দ কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সী আল জাহাঙ্গীর”

সৈয়দ কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর বা ঈমান আল সুরেশ্বরী
ভূমিকা:
হৃদয়ের গভীরে যখন সত্যের অনির্বাণ শিখা প্রজ্বলিত হয়, তখন সেই আলোকচ্ছটা এক মূর্ত রূপ ধারণ করে—যেন এক জ্যোতির্ময় আলোকবর্তিকা দিগন্ত উদ্ভাসিত করে তোলে। সৈয়দ কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সী আল জাহাঙ্গীর সেই সত্যেরই এক অনুপম প্রকাশ। তাঁর নাম উচ্চারিত হতেই আধ্যাত্মিকতার সুগভীর সুর হৃদয়ে অনুরণিত হয়, প্রেম ও ভক্তির এক শান্ত অথচ শক্তিশালী ঢেউ যেন অন্তরাত্মাকে স্পর্শ করে যায়। তিনি সেই জ্যোতির্ময় পথের দিশারী, যাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে সত্যের দ্যুতি এবং ভালোবাসার পরশ বিদ্যমান। তাঁর আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রদীপ প্রজ্বলিত করেছেন তাঁরই পরম শ্রদ্ধেয় পিতা, জ্ঞানজ্যোতির উৎস, চেরাগে জানশরীফ সৈয়দ কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী এবং মহীয়সী মাতা, আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতিমা, হযরত রোকেয়া আল মাইজভান্ডারী। তাঁর পিতামহ (দাদা) ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা হেলাল উদ্দিন ফুরফুরী (রহ.)। এই পবিত্র বংশপরম্পরাই যেন বাবা বেদম ওয়ার্সীর সত্তায় মাওলাইয়াতের এক ঐশ্বরিক আভা দান করেছে। “সত্যের একটি মূর্ত আলোকবর্তিকার নাম বাবা বেদম ওয়ার্সী আল জাহাঙ্গীর। বাবা জাহাঙ্গীর যার মাওলা, বাবা বেদমও তার মাওলা।” এই গভীর উচ্চারণই তাঁর আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্যকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

সৈয়দ কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সী আল জাহাঙ্গীর
তাঁর জ্যোতির্ময় আবির্ভাব:
১৯৭৩ সালের ২০শে মে, প্রকৃতির নীরবতায় মগ্ন এক স্নিগ্ধ রবিবারের দুপুরে, যখন সময় থেমে গিয়েছিল এক পবিত্র মুহূর্তের প্রতীক্ষায়, ঠিক দ্বিপ্রহরের সময় এই ধরাধামে এক মহাপুরুষের আগমন ঘটে। তিনি আর কেউ নন, তিনি পরম প্রেমময়, পীরে এলমে লাহুতি, বিনয়ের প্রতিমূর্তি, যুগ সংস্কারক, ফকিরনী দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা মহামান্য পীর ও মুর্শিদ, মাওলা উল আলা, চেরাগে জান শরীফ কালান্দার ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরীর রুহানিয়াত ও জিসমিয়াত ঔরসে এবং মাতৃকুলের আদর্শ, পরম মমতাময়ী, গুরু ও স্বামী সেবার বিরল প্রতিচ্ছবি, সাধিকাকুলের আদর্শ, ত্যাগের মূর্তপ্রতীক, মারেফতের ভান্ডার গাউসুল আযম বাবা গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারীর সুযোগ্য আধ্যাত্মিক উত্তরসুরী বাবা শফিউল বশর মাইজভান্ডারীর মুরিদ ও খলিফা মা রোকেয়া বেগম আল মাইজভান্ডারীর পবিত্র গর্ভ আলো আবির্ভূত হলেন মারেফতের উজ্জ্বল সূর্য, যাঁর তুলনা মেলা ভার, সেই শত-সহস্র সাধকের প্রাণের স্পন্দন, মিসকিন ও মাস্তানকুলের সর্দার, ফকিরদের মাথার তাজ, আশেক-পাগলদের হৃদয়ের জজবা, প্রেমের মহাজন শাহ্ সুফি সৈয়দ মাওলা উল আলা কালান্দার বাবা বেদম শাহ্ ওয়ার্সী আল জাহাঙ্গীর।
এই শুভ লগ্নে একই দিনে একই সময়ে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয় বাবা জাহাঙ্গীরের পবিত্র আঙিনা। তাঁরই আধ্যাত্মিক পথের দিশারী, কেবলা ও কাবা শাহ্ সুফি সৈয়দ বাবা জালাল নুরী অফিআনহু আল সুরেশ্বরী এবং তাঁর দ্বিতীয় শাহ্জাদা শাহ্ সুফি সৈয়দ বাবা বেলাল নুরী আল সুরেশ্বরী—তাঁরা উভয়েই বাবা জাহাঙ্গীরের আবাসে প্রথমবারের মতো পদার্পণ করেন। একদিকে প্রিয় পুত্রের শুভ আবির্ভাব, অন্যদিকে পীর ও মুর্শিদের প্রথম শুভাগমন—এই অভাবনীয় সমাপতন সেই বিশেষ দিনটিকে এক অমলিন স্বর্গীয় স্মৃতিতে পরিণত করে। এই তাৎপর্যপূর্ণ দিনটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী প্রতি বছর ২০শে মে ওরশ মোবারক উদযাপন করেন। এই বিশেষ দিনটিকে কেন্দ্র করেই তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত “ফকিরনী দরবার শরীফ”-এ প্রথম প্রেমের অমৃত আসরের শুভ সূচনা করেন।
“পিতা: জ্ঞানের আলোকস্তম্ভ”
এই সেই কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সী, যাঁর পিতা কেবল একজন ওলীই ছিলেন না, বরং জ্ঞানের এক প্রোজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ ছিলেন। বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী (রহ.) ছিলেন পীর ও মুর্শিদ, আধ্যাত্মিক জগতের পথপ্রদর্শক, যিনি সত্যের সন্ধানে সর্বদা ব্যাকুল ছিলেন। তিনি ছিলেন মুজাদ্দিদে জামান, ধর্মের সংস্কারক, যিনি মানব হৃদয়ে দ্বীনের সঠিক মর্মবাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। সুফি দর্শনের গভীর তত্ত্ব তাঁর জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় মূর্ত হয়ে উঠত। তিনি ছিলেন পীরে এলমে লাহুতি, ঐশ্বরিক জ্ঞানের অধিকারী, যাঁর প্রতিটি কথায় প্রজ্ঞা ও ভালোবাসার এক অনুপম মিশ্রণ দেখা যেত। “চেরাগে মুহাম্মদ” ও “চেরাগে জান শরীফ” উপাধিতে ভূষিত এই মহাপুরুষ আল্লামা ও কালান্দার হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। শুধু আধ্যাত্মিক জ্ঞানই নয়, তিনি মহাজাতক হোমিওপ্যাথ ডাক্তার হিসেবেও মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। মাওলানা বাবা জাহাঙ্গীর ইকবাল ইবনে হেলাল রাহিমাহুল বারী ছিলেন এক ব্যতিক্রমী জীবনগাথার প্রতিচ্ছবি। তিনি শুধু বাবা বেদম ওয়ার্সীর পিতাই ছিলেন না, বরং তিনিই ছিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু ও পথের প্রথম দিশারী।
১৯৩৮ সালের ২৫শে আগস্ট এই জ্ঞানতাপসের শুভ আবির্ভাব ঘটে। তাঁর জন্মলগ্ন থেকেই যেন এক বিশেষ বার্তা বহন করছিল। মাত্র বিশ বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন, তবুও পিতার আদর্শ ও শিক্ষা তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পিতার মতোই তিনিও সংস্কারমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষভাবে কলম ধরেছিলেন স্বজাতির আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মুক্তির জন্য। তাঁর প্রথম গ্রন্থ “গরিবের আসল নেতা কে?” তৎকালীন আইয়ুব খান সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল, যা তাঁর নির্ভীক ও সত্যনিষ্ঠ কণ্ঠের পরিচয় দেয়। পরবর্তীতে “মারফতের গোপন কথা” বইটি এরশাদ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং এই কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।
বাবা জাহাঙ্গীর ছিলেন জ্ঞানের এক বিশাল সমুদ্র। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের গভীরতার পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষাতেও তিনি ছিলেন প্রখর। তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিকতার গভীর তত্ত্বজ্ঞানকে সকলের কাছে সহজবোধ্য করে তুলেছে। “সুফিবাদ আত্মপরিচয়ের একমাত্র পথ”, “মারেফতের বাণী”, “ইতিহাস নয় সুফিবাদের রহস্য” তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলির মধ্যে অন্যতম। তাঁর জ্ঞানগর্ভ ওয়াজ ও আধ্যাত্মিক আলোচনা বহু পথহারা মানুষকে সত্যের সন্ধান দিয়েছে। তিনি “ফকিরনী দরবার শরীফ” প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও জ্ঞান পিপাসু ও আধ্যাত্মিক পথের যাত্রীদের জন্য এক পবিত্র আশ্রয়স্থল।
বাবা জাহাঙ্গীর কেবল একজন আধ্যাত্মিক নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক ও মানবতাবাদী। সমাজের কুসংস্কার ও গোঁড়ামি দূর করতে তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সহানুভূতি ছিল অপরিসীম। তিনি নিঃস্বার্থভাবে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। ২০২০ সালের ২৫শে এপ্রিল এই মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান, তবে তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞান ও আদর্শ আজও তাঁর অনুসারীদের পথ আলোকিত করে চলেছে। বাবা বেদম ওয়ার্সীকে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরসূরী হিসেবে মনোনীত করে গিয়েছেন, যাঁর মাধ্যমে তাঁর জ্ঞান ও প্রেমের ধারা আজও প্রবাহিত হচ্ছে।
“মাতা: মমতার প্রতিচ্ছবি”
বাবা বেদম ওয়ার্সীর মাতা ছিলেন হযরত রোকেয়া আল মাইজভান্ডারী (রহ.), যিনি ছিলেন মাতৃকুলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন গাউসুল আযম বাবা গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারীর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের ধারক বাবা শফিউল বশর মাইজভান্ডারীর মুরিদ ও খলিফা। মা রোকেয়া বেগম ছিলেন মমতার প্রতিচ্ছবি, যিনি গুরু ও স্বামীর সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। সাধিকাকুলের আদর্শ এই মহীয়সী নারী ত্যাগের মূর্ত প্রতীক ছিলেন এবং মারেফতের এক অফুরন্ত ভান্ডার ধারণ করতেন। তাঁর পবিত্র গর্ভ আলো করেই বাবা বেদম ওয়ার্সীর মতো এক মহাপুরুষের জন্ম হয়েছিল।
“দাদা: জ্ঞানের প্রদীপ”
বাবা বেদম ওয়ার্সীর দাদা ছিলেন মাওলানা হেলাল উদ্দিন আহমেদ ফুরফুরী (রহ.), যিনি ছিলেন বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরীর পিতা এবং জ্ঞানের এক প্রদীপ্ত শিখা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের এমএবিটি ডিগ্রিধারী এই মহান ব্যক্তিত্ব শিক্ষাজীবনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে ১৯২১ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে এম.এ. ডিগ্রি অর্জনকারী কেরানীগঞ্জের প্রথম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, তিনিই ছিলেন কেরানীগঞ্জের প্রথম এম.এ. বি.টি., যা তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও পাণ্ডিত্যের পরিচায়ক। বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে তিনি বহু ছাত্রের জীবনে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছেন। তাঁর পিতা ছিলেন শাহ সুফি সৈয়দ কাজীমউদ্দীন আহমেদ চিশতী এবং মাতা ইয়ারন্ নেসা ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও প্রগতিশীল রমণী, যিনি সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
বংশ পরম্পরায় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য:
সৈয়দ কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সী আল জাহাঙ্গীরের বংশপরম্পরা আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সাধনার এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য বহন করে। পিতার দিক থেকে যেমন তিনি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উত্তরাধিকারী, তেমনই মাতার দিক থেকেও লাভ করেছেন আধ্যাত্মিক সাধনার প্রেরণা। তাঁর পিতামহ ছিলেন প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা হেলাল উদ্দিন ফুরফুরী (রহ.)। এছাড়াও, তাঁর বংশে আরও অনেক জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তি বিদ্যমান ছিলেন, যাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাবা জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠ চাচা মাওলানা সদর উদ্দিন আহম্মদ চিশতী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ চাকরি ছেড়ে সুফি দর্শনের জ্ঞান বিতরণে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং “বাংলার বিজ্ঞানী গ্যালিলিও” নামে পরিচিত ছিলেন। অন্য চাচাদের মধ্যে ডক্টর প্রফেসর সরফুদ্দিন আহমেদ এবং ডক্টর প্রফেসর কামাল উদ্দীন আহমেদের মতো শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানীও ছিলেন। এই পবিত্র বংশপরম্পরাই যেন বাবা বেদম ওয়ার্সীর সত্তায় মাওলাইয়াতের এক ঐশ্বরিক আভা দান করেছে।
“তাঁর কর্ম ও জীবনের আধ্যাত্মিক বিস্তার” :
এই সেই কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সী, যাঁর আবির্ভাবের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন বাবা জাফর শাহ্ ফকির এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মাধ্যমে। তিনি বলেছিলেন, “এই বালকের (বাবা বেদম ওয়ার্সী) জাগতিক পড়াশোনায় তেমন মনোযোগ থাকবে না! এর মাঝে মারেফতের এক প্রদীপ্ত সূর্য সুপ্ত রয়েছে! যেদিন সেই জ্যোতির্ময় সত্তা জাগ্রত হবে, হে জাহাঙ্গীর! তুমিও তাঁর সামনে ম্লান হয়ে যাবে!” আপাতদৃষ্টিতে এই বাক্যগুলো হয়তো নীতিশাস্ত্রের কঠিন মানদণ্ডে বিচার্য হতে পারে। তবে যদি আমরা প্রেমশাস্ত্রের আলোকে এই বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করি, তাহলে উপলব্ধি করতে পারব পিতা তাঁর পুত্রের আধ্যাত্মিক উচ্চতায় আনন্দিত হচ্ছেন এবং পুত্রও আপন পিতাকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে বিনম্র থাকছেন। এটি আসলে আশেক ও মাশুকের এক গভীর ও গোপন প্রণয়লীলা। নীতিশাস্ত্রের পণ্ডিতদের কাছে এই রহস্যময় জগতের চাবি অধরা। তাই তাঁরা প্রেমের নির্মল ভাষার মধ্যেও প্রতিযোগিতার ছায়া দেখতে পান। ভালো ও মন্দ—এই দুটি ভাব যেন একে অপরের প্রতিযোগী। কিন্তু প্রেমের অনন্ত জগৎ এই দ্বৈততার ঊর্ধ্বে, যেখানে কোনো ভেদাভেদ নেই, নেই কোনো প্রতিযোগিতা।
মহাপুরুষের ভবিষ্যৎবাণী কখনো মিথ্যা হতে পারে না। কারণ তাঁদের জ্ঞান জাগতিক কল্পনার সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়। তাঁদের দৃষ্টি ত্রিকালদর্শী।
বাবা জাফর শাহ্ ফকিরের সেই ভবিষ্যৎবাণী বাস্তবতার আলোয় উদ্ভাসিত হতে শুরু করে যখন বাবা বেদম ওয়ার্সী শৈশব থেকেই কাওয়ালী, মুর্শিদি ইত্যাদি উচ্চাঙ্গের গানে প্রেমের মাস্তিতে বিভোর হয়ে নৃত্য ও জিকিরের মাধ্যমে এক মহাচৈতন্যময় রূপ ধারণ করতে থাকেন। বাবা জাহাঙ্গীর প্রায়শই আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের মূর্ছনায় নিমগ্ন থাকতেন এবং সেই সঙ্গীতের উন্মাদনায় কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সীও এক অনির্বচনীয় উদ্দীপনায় উদ্ভাসিত হতেন। বাংলার প্রখ্যাত কাওয়াল কদম রসুল এই বিস্ময়কর বালকটির নাম রাখেন “বেদম ওয়ার্সী”।
এই সেই কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সী, যিনি মাত্র বারো বছর বয়সে আপন পিতা ও মুর্শিদ কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীরের ঐকান্তিক আদেশে হাজা হবিবুল্লাহ্, মাতা ফি হুব্বুল্লাহ্, শাহেন শাহে ওলী, আফতাবে ওলী, সুলতানুল হিন্দ, হিন্দাল ওলী, আতায়ে রাসুল বাবা শেখ সৈয়দ মাওলানা মইনুদ্দিন হাসান সানজারী আল হুসাইনি ওয়াল হাসানি’র (আ) পবিত্র দরগাহ্’র অদূরে তারাগড় পর্বতে দীর্ঘ চার মাস কঠোর ধ্যান-সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। বাবা জাহাঙ্গীর অকপটে ঘোষণা করেছিলেন, “আমার বেদম মাদারজাত ওলী”। মায়ের গর্ভ থেকেই ওলী হয়ে আসার পরেও এত অল্প বয়সে কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সীর এই কঠোর তপস্যা সত্যিই বিস্ময়কর এবং এটি কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সীর উপর তাঁর পীর ও মুর্শিদ কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীরের বিশেষ কৃপাদৃষ্টি ও সুদূরপ্রসারী আধ্যাত্মিক পরিকল্পনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। মুর্শিদ কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সীকে আপন গৃহে একটি নির্দিষ্ট কক্ষে নির্জন পরিবেশে নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে বছরের পর বছর ধরে অত্যন্ত আদর ও যত্নের সাথে ধ্যানযোগের সাধনা করিয়ে তাঁর যোগ্য আধ্যাত্মিক উত্তরসূরী হিসেবে গড়ে তোলেন। এমনকি কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সী বেশ কিছুকাল এক পীর সাহেবের বাড়িতে বাবা জাহাঙ্গীরের আদেশে গোলামীও করেছেন, সেবা দিয়েছেন।
পীর ও মুর্শিদ কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর সর্বদা একজন কামেল মুর্শিদের সান্নিধ্যে ধ্যান-সাধনার গুরুত্বের উপর অপরিসীম জোর দিয়েছেন। তাঁর রচিত মূল্যবান গ্রন্থাবলী পাঠ করলে এবং তাঁর জ্ঞানগর্ভ ওয়াজ শ্রবণ করলে এই গভীর সত্য উপলব্ধি করা যায়। কারণ একমাত্র ধ্যান সাধনাই একজন শিষ্যকে অনুমানের অস্পষ্ট জগৎ থেকে বের করে এনে প্রত্যক্ষ ঐশ্বরিক অভিজ্ঞতার জ্যোতির্ময় সাগরে নিমজ্জিত করতে পারে। ধ্যান সাধনা তথা মোরাকাবা মোশাহেদা ছাড়া অর্জিত জ্ঞান যতই সুন্দর ও আকর্ষণীয় হোক না কেন, তা আসলে অন্তঃসারশূন্য ও অপূর্ণ।
বাবা জাহাঙ্গীরের মতোই বাবা বেদম ওয়ার্সীও এই গভীর সত্যকে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন। তাই আপন মুর্শিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাবা বেদম ওয়ার্সীও তাঁর ভক্তদের জন্য ধ্যান সাধনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এই মহৎ লক্ষ্যে তিনি জয়পুরহাট জেলার সদর উপজেলায় খঞ্জনপুর গ্রামে (রাজবাড়ির পেছনে, রিপন মোল্লার বাড়ি) একটি নিবিড় ধ্যান সাধনার স্কুল তথা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। এছাড়াও তাঁর ঐকান্তিক নির্দেশে মহান সুরেশ্বর দরবার শরীফ প্রাঙ্গণে ক্রয়কৃত জমির উপর প্রতিষ্ঠিত বহমান মঞ্জিলে ভক্তরা নিয়মিতভাবে ধ্যান সাধনায় মগ্ন থাকেন।
তবে সাম্প্রতিককালে কিছু লেবাসধারী পীর সাহেব সুন্দর সুন্দর কথার মায়াজাল বিস্তার করে নতুন ভক্ত তৈরিতে অত্যন্ত পারদর্শী হলেও, তাঁরা নিজেরা যেমন গভীর ধ্যান সাধনায় নিমগ্ন হন না, তেমনি তাঁদের অনুসারীদেরও এই অমূল্য শিক্ষা প্রদানে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হন। ধ্যান সাধনার কথা শ্রবণমাত্রই তাঁরা যেন এক অজানা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ওহাবী, গোলাবী ওহাবী, খারেজী, শিয়া, অথবা তথাকথিত গোলাবী সুন্নি সম্প্রদায় হয়তো ধ্যান সাধনাকে অস্বীকার করতে পারে, কিন্তু যারা পীর সাহেবের খাতায় নিজেদের নাম লিখিয়ে মহানবী (সাঃ)-এর হেরা গুহার সেই গভীর ধ্যান সাধনার সামান্যতম মূল্যও দেয় না, তাদের আন্তরিকতা নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ। এদের মুখনিঃসৃত বাণীতে আপনি হয়তো সম্মোহিত করার মতো মেকি যুক্তি খুঁজে পাবেন, মস্তিষ্ক ধোলাই করার জন্য অপপ্রচার ও সূক্ষ্মতম চাতুরী প্রত্যক্ষ করবেন, কিন্তু এদের কাছে সত্যের সন্ধান পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। সত্যের অন্বেষণে আপনাকে প্রবেশ করতে হবে ধ্যান সাধনার নিভৃত ও পবিত্র কক্ষে। আবার অনেকে হয়তো চার মাস, আট মাস, বারো মাস বা ষোল মাস তথাকথিত ধ্যান সাধনা করে নিজেরাই কামেল সেজে বসেছেন! চরম সত্যটি হলো, কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা গুনে ধ্যান করলেই কামালিয়াত লাভ করা যায় না। এর সাথে অপরিহার্য আপন মুর্শিদ ও তাঁর পবিত্র বংশের প্রতি পূর্ণ আস্থা, অবিচল বিশ্বাস, গভীর ভক্তি ও অকৃত্রিম প্রেম হৃদয়ে ধারণ করে আত্মসমর্পণের সুগভীর ভাবনায় অগ্রসর হওয়া। কারণ সাধনা করে বাহ্যত কিছু অর্জন করা যায় না, বরং প্রকৃত সাধনার মাধ্যমে নিজের ভেতরের সমস্ত কিছু বিলীন করে দিতে হয়। সেই “সমস্ত কিছু” আসলে কী? সেটি হলো নিজের ক্ষুদ্র বাসনা। নিজের কামনা-বাসনাকে অক্ষুণ্ণ রেখে বাহ্যিক সাধক সাজার ভান করা যায়, কিন্তু প্রকৃত সাধকের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়া যায় না। বাবা বেদম ওয়ার্সী যথার্থই বলেছেন, “তোমরা কি জানো মুরিদ অর্থ কি? মুরিদ অর্থ হচ্ছে মৃত। যার কোন নিজস্ব সাধ, বাসনা, ইচ্ছা অবশিষ্ট নেই তিনিই মুরিদ।” (এটি হুবহু উদ্ধৃতি নয়, মূল ভাব প্রকাশ করা হয়েছে)।
অবশেষে, সেই বিশেষ চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত সাধকের উপর যদি মুর্শিদের অসীম দয়া বর্ষিত হয়, তবেই কেবল মোহ-মায়ার অদৃশ্য বন্ধন পূর্ণমাত্রায় ছিন্ন করে তৌহিদের অনন্ত রাজ্যে প্রবেশ করা সম্ভব। অন্যথায় এটি একেবারেই অসম্ভব। এটি এক কঠিন, অনস্বীকার্য সত্য। “গুরুর বাড়িতে ভক্তের নিঃস্বার্থ সেবা ও গোলামী”—এই গভীর বিষয়টি উপলব্ধি করা এবং জীবনে এর যথাযথ প্রয়োগ ঘটানো একজন ভক্তের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নিঃস্বার্থ সেবা ও গোলামীর মাধ্যমেই ভক্ত তাঁর গুরুর প্রতি এবং গুরুর পবিত্র পরিবারের প্রতি গভীর আসক্ত হয়ে পড়েন, এবং এই আসক্তি মোরাকাবা ও মোশাহেদার সূক্ষ্ম মুহূর্তে সাধককে বিশেষভাবে সাহায্য করে থাকে।
বাবা বেদম ওয়ার্সী সাধকের আধ্যাত্মিক উন্নতির এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে গুরুর পবিত্র আবাসে ভক্তের নিঃস্বার্থ সেবা ও গোলামীর এই চিরায়ত প্রক্রিয়াটিকে আরও আধুনিক ও গতিশীল করেছেন। কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সী এক উলঙ্গ সত্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি যেখানেই তাঁর আধ্যাত্মিক পবিত্র আস্তানা স্থাপন করেন, সেখানেই যেন এক আনন্দময় মিলনমেলা বসে যায়। তবে সেই মেলা নীতিশাস্ত্রের জটিল তত্ত্বে আবদ্ধ পণ্ডিত, শুষ্ক যুক্তিবাদী ও তথাকথিত ভদ্রলোকদের কৃত্রিম মেলা নয়! সেই মেলা হচ্ছে প্রেমশাস্ত্রের জ্ঞানপিপাসু ফকির, আত্মভোলা মাস্তান ও উলঙ্গ মুর্শিদপ্রেমিকদের এক পবিত্র মিলনক্ষেত্র!
বাবা জাহাঙ্গীর ২০২০ সালের ২৫শে এপ্রিল লোকচক্ষুর অন্তরালে যাওয়ার পূর্বে বাবা বেদম ওয়ার্সীকে তাঁর সকল অনুসারীর জন্য রেহেনুমা তথা পথপ্রদর্শক, সম্যক জ্ঞানদানকারী ও সাকার মুক্তিদাতা রূপে এক অমূল্য আমানত রেখে গিয়েছেন। বাবা জাহাঙ্গীর এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো খলিফা, আম খলিফা, নিবেদিত সাধক, অনুরাগী মুরিদ, ব্যাকুল আশেক অথবা তাঁর পবিত্র পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের মতামত গ্রহণ করেননি যেমনি করেন নি মাওলা মুহাম্মদ সাল্লামাহু মাওলা আলী (আ:)-এর অভিষেক দিবসের দিন ঐতিহাসিক খাদিরে দিবসের প্রেক্ষাপটে।
উপসংহার:
সৈয়দ কালান্দার বাবা বেদম ওয়ার্সী আল জাহাঙ্গীর কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি সত্যের এক জীবন্ত প্রকাশ। এক পবিত্র বংশপরম্পরার উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক রূপে তাঁর আবির্ভাব, জ্ঞানালোকিত পিতা ও মমতাময়ী মাতার সান্নিধ্য, এবং আধ্যাত্মিক গুরুদের আশীর্বাদ—এই সবকিছুই তাঁর জীবনকে এক অসাধারণ মহিমায় মণ্ডিত করেছে। বাল্যকাল থেকেই তাঁর মধ্যে যে আধ্যাত্মিক উন্মাদনা ও প্রেমময় আকুলতা দেখা গেছে, তা যেন তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী ছিল।
পিতা কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং তাঁর নির্দেশিত কঠোর সাধনা বাবা বেদম ওয়ার্সীকে আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি কেবল পিতার উত্তরসূরী নন, বরং তাঁর দেখানো পথের একনিষ্ঠ অনুসারী এবং সেই পথের আলোকবর্তিকা। ধ্যান সাধনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি যেমন নিজে সেই পথে অগ্রসর হয়েছেন, তেমনই তাঁর অনুসারীদেরও সেই পথে আহ্বান জানিয়ে পরিচালিত করে যাচ্ছেন
বাবা বেদম ওয়ার্সীর জীবন প্রেম ও সত্যের এক অপূর্ব সমন্বয়। তিনি সেই মিলনমেলার কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে নীতিশাস্ত্রের কঠিন বেড়াজাল ভেঙে প্রেমশাস্ত্রের উদার আকাশ উন্মুক্ত হয়। তাঁর সান্নিধ্যে জ্ঞানপিপাসু ফকির, আত্মভোলা মাস্তান ও মুর্শিদপ্রেমিকদের এক পবিত্র মিলন ঘটে। পিতা কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীরের রেখে যাওয়া অমূল্য আমানত রূপে তিনি আজ তাঁর অনুসারীদের পথপ্রদর্শক, জ্ঞানদানকারী ও মুক্তির দিশারী। সত্যের এই জ্যোতির্ময় প্রকাশ যুগে যুগে ভক্তদের হৃদয় আলোকিত করে রাখবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক : আনিসুর রহমান জাফরী গোলামে ওয়ার্সী আল জাহঙ্গীর বা-ঈমান সুরেশ্বরী।