
জ্বালানি তেলের সংকট- বিশ্ব রাজনীতির মারপ্যাঁচ নাকি অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের কারসাজি?
ঈদের আনন্দ যখন দুয়ারে সমাগত, যখন নাড়ির টানে ঘরমুখো মানুষের স্রোত রাজপথে আছড়ে পড়ছে, ঠিক তখনই দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র হাহাকার এক চরম অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। পাম্পগুলোতে তেলের জন্য মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রতীক্ষার পর ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড দেখে রিক্তহস্তে ফিরে যাওয়া এখন সাধারণ চিত্র। নেত্রকোনার পূর্বধলার মতো মফস্বল এলাকা থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত এই হাহাকার ছড়িয়ে পড়েছে। আলোচিত ইসলামি বক্তা মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানীর মতো অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দুর্ভোগের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা মূলত দেশের আপামর জনমানসের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন উঠেছে, এই গভীর সংকটের মূলে আসলে কী? বিশ্বজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি, নাকি দেশের ভেতরের কোনো শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্রের অধিক মুনাফার লালসা?
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে সংকটের স্বরূপ:
অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী, সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতা থেকেই সংকটের জন্ম হয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি কেবল প্রাকৃতিক কোনো সংকট নয়। বিশ্ববাজারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন (Supply Chain) বিঘ্নিত হওয়া একটি বাস্তব সত্য। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে যে ধরণের হাহাকার দেখা যাচ্ছে, তা কেবল ‘যুদ্ধের প্রভাব’ বলে চালিয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সামান্যতম গুঞ্জন উঠলেই দেশের অভ্যন্তরীণ মজুতদার ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাত্ত্বিকভাবে একে বলা হয় ‘আর্টিফিশিয়াল স্কার্সিটি’ বা কৃত্রিম সংকট। যখন তেলের চাহিদা তুঙ্গে থাকে (যেমন ঈদের সময়), তখন অধিক মুনাফার আশায় তেল মজুত করে রাখা হয়। ফলে পাম্পগুলো থেকে সাধারণ মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ পর্দার আড়ালে চড়া দামে তেল বিক্রির অভিযোগ উঠছে। এই অশুভ চক্র মূলত জনগণের পকেট কাটতে এবং নতুন সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এই পরিস্থিতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব:
জ্বালানি তেলের এই অভাব কেবল যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে না, বরং এর একটি বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তেলের অভাবে গণপরিবহন কমে যাওয়ায় ভাড়ার লাগাম ছিঁড়ে গেছে। সাধারণ মানুষ নিজের গাড়ি নিয়ে স্বজনদের বাড়ি যেতে পারছে না, আবার অতিরিক্ত ভাড়ার ভয়ে অনেকেই ঘর হতে বের হতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষের ঈদ আনন্দ আজ চরমভাবে মলিন।
আমাদের প্রত্যাশা ও করণীয়:
জ্বালানি সংকটের মূল কারণগুলো দ্রুত বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি। যদি এটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রভাব হয়, তবে সরকারকে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ (Diversification) এবং বিকল্প জ্বালানির পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করতে হবে। আর যদি এটি অশুভ সিন্ডিকেটের কারসাজি হয়, তবে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় সোপর্দ করতে হবে। কোনো কুচক্রী মহল যেন সাধারণ মানুষের মৌলিক প্রয়োজন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে, সেদিকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো অপরিহার্য।
জনগণের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখা এবং দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা রাষ্ট্র ও সচেতন নাগরিক—উভয়েরই নৈতিক দায়িত্ব। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার করবে এবং পাম্পগুলোতে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।