
দেশটা স্বাধীন করেছিল লুঙ্গি পড়া সাধারণ মানুষ। কৃষক,শ্রমিক, মুটে,মজুর,শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, নারী -পুরুষ, আবাল,বৃদ্ধ, ছাত্র, যুবক, মেহনতী খেটে খাওয়া মানুষেরা। সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধ পরিণত হয়েছিল জনযুদ্ধে। দলমত নির্বিশেষে সবাই ঝাপিয়ে পড়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে। ৩০ লাখ শহীদের তাজা রক্ত ও ৩ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত সম্ভ্রমের বিনিময়ে জাতি পেয়েছিল একটি লাল সবুজের পতাকা, ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের একটি মানচিত্র, নিজেদের সংবিধান, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব, মানবতা, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার, নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্যে, বাসস্থান সহ সকল প্রকার মৌলিক অধিকার।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মৌলিক ৪টি ধারা : – জাতীয়তাবাদ ২ সমাজতন্ত্র ৩ গণতন্ত্র ৪ ধর্মনিরপেক্ষতা।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হয়ে এসে বলতে হয় চেতনার মৌলিক অবস্থা কি? মুখে মুখে চেতনার কথা বলা হয়! বাস্তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা চেতনায় ৭১ কেমন আছে?
চেতনায় ৭১ ভালো নেই। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পার হয়ে স্মৃতির পাতায় ইতিহাস ঝাপসা হয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধ মানে ৩০ লাখ শহীদকে শ্রদ্ধা অবনত হয়ে স্বরণ করা। ৩ লাখ মা বোনের সম্ভ্রম হারানোকে অঞ্জলি দিয়ে ত্যাগের মহিমাকে শিকার করা। বাস্তবতা হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোন দল, ব্যাক্তির ফসল নয়। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী নিয়ে জাতির উন্মাদনা কতটুকু? ইতিহাসের খন্ডিত চর্চায় মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র কতটা উঠে আসছে। চেতনার নামে যারা মায়াকান্না করে আকাশ বাতাস ভারি করে তুলছে মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান কতটুকু? সম্মুখ যুদ্ধে অস্ত্র হাতে যারা স্বাধীনতার সোনালী সূর্য টা ছিনিয়ে এনেছে, তাদের নিয়ে এখন কটাক্ষ করা হয়। এতে করে চেতনার কি অবস্থা হয়? স্বাধীন দেশে সমঅধিকার নিয়ে বাস করাই জাতীয়তাবাদ কিংবা গণতন্ত্র। সকলের কর্ম ত্যাগের মূল্যায়ন করা স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। জাতি আজ ভুলে বসে আছে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কে ছিলেন? অনেকেই জানেনা ১১জন সেক্টর কমান্ডারের নাম। যুদ্ধ চলাকালীন অস্থায়ী সরকার প্রধান সহ সেই সরকারের সদস্য কারা ছিলেন? তাদের কতটা মূল্যায়ন কিংবা স্বরণ করা হয়! পঙ্গু, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, শহীদদের নামের তালিকা, বধ্যভুমি চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করা, সম্ভ্রম হারানো মা,বোনদের পুনর্বাসন সামাজিক মর্যাদা এসব কোন মাথা ব্যাথা নেই।
স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পার করছে জাতি। মুক্তযুদ্ধের চেতনা কতটা বাস্তবায়ন হলো? জাতির সুর্য সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কতটা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায় দেশ ও জনতা ভাল নেই। ভালো নেই জাতির স্রেষ্ঠ সন্তানেরা! প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই তাদের স্বাধীন করা দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। পরিবার ছেড়ে বিদেশের মাটিতে তাদের মৃত্যু হচ্ছে। কেউ রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, আবার কাউকে ভিক্ষা করতেও দেখা গেছে। স্বাধীনতার ৫০ পছর পর আবার বীর মুক্তিযোদ্ধার খেতাব কেড়ে নেওয়ার ধৃষ্টতা দেখানো হয়। মুক্তিযুদ্ধে যাদের বিন্দুমাত্র অবদান নেই তাদের দেখা যায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সমালোচনায় মুখর হতে। এমনকি উড়ে এসে জুড়ে বসা এসব দুর্বৃত্তরা মুক্তিযোদ্ধাদের রাজাকার বলতেও শোনা যায়। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে হিসেবের সময় এসেছে “মহান মুক্তিযুদ্ধে কার অবদান কতটুকু? কে কোন অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছেন। প্রকৃত অর্থে যাঁরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, সন্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন তারাই এদেশ জাতির গর্বিত সন্তান। সবার আগে তাদের মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি। এদের কামার, কুমার, জেলে, তাতে,বাঙালি, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, আদিবাসী, উপজাতি,লেখক, শিল্পী,সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী সকলেই আপন আপন অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। যে কারণেই মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির গণযুদ্ধে পরিণত হয়।দলমতের উর্দ্ধে উঠে সকল রাজনৈতিক দলের এই যুদ্ধে অবদান রয়েছে। তাই ৩০ লাখ শহীদের তাজা রক্তের প্রতি, ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ওদের চিহ্নিত করার সময় এসেছে। দেশের সকল বধ্যভূমি চিহ্নিত করে সংরক্ষণের ব্যাবস্থা নিতে হবে। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও কর্মসংস্থান করা। ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে হবে। ইতিহাসের পাতায় প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা, কোন ব্যাক্তির বন্দনা নয়, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, সেক্টর কমান্ডারদের যথাযথ মূল্যায়ন, বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন, শামসুল হক,মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দ্রষ্টা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সহ মহান মুক্তিযুদ্ধে সকলের অবদান তুলে ধরতে হবে। ৭১ এ মীমাংসিত মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিতর্কিত না করে চেতনা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনতে হবে। চেতনা নিয়ে মিথ্যা স্যান্ডবাজি না করে চেতনা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে দেশের মাটিতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোন দল কিংবা ব্যাক্তির অন্যায় মেনে নেওয়া নয়।আর কোন দল কিংবা ব্যাক্তির ব্যাক্তিগত সম্পদ নয়। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীর স্লোগান হোক, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, মানবতা, মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম।