
উষ্ণ সম্পর্কের এক সময়ে স্বাক্ষরিত ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তিটি ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখ বদলের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকারিতা হারায়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এক বছরের জন্য চুক্তির সীমাবদ্ধতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে সাড়া দেননি।জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ‘ভয়াবহ মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেন এবং দ্রুত আলোচনার টেবিলে বসার জন্য ওয়াশিংটন ও মস্কোর প্রতি আহ্বান জানান।এক বিবৃতিতে গুতেরেস বলেন, গ্রিনিচ মান সময় মধ্যরাত বা নিউইয়র্কে সন্ধ্যা সাতটার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তিটি শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর এই প্রথম আমরা এমন এক বিশ্বের মুখোমুখি, যেখানে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর কোনো বাধ্যতামূলক সীমা নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক দশকের অর্জনের এই বিলুপ্তি এর চেয়ে খারাপ সময়ে আসতে পারত না—পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।’ ইউক্রেন যুদ্ধে শুরুর দিকে কৌশলগত নয়, এমন পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত দেওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি।পোপ লিও চতুর্দশ বলেন, নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে উভয় পক্ষকে ‘সম্ভাব্য সবকিছু’ করতে হবে।সাপ্তাহিক সাধারণ দর্শনে মার্কিন বংশোদ্ভূত পোপ বলেন, ‘আমি আপনাদের অনুরোধ জানাই—এই ব্যবস্থাটি পরিত্যাগ করবেন না, বরং এটি যেন বাস্তব ও কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হয়, তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিন।’
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, চুক্তির প্রেক্ষাপটে উভয় দেশই এখন আর কোনো বাধ্যবাধকতা বা সমান্তরাল ঘোষণার মধ্যে নেই বলে তারা মনে করে।এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রাশিয়া দায়িত্বশীল ও বিচক্ষণভাবে কাজ করতে চায়।’ তবে একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়, জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে তারা ‘নির্ণায়ক’ পাল্টা ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং দীর্ঘদিনের স্থগিতাদেশ ভেঙে আবার পরমাণু পরীক্ষা শুরুর কথাও বলেছেন, যদিও তা বাস্তবায়নে তিনি এখনো কোনো পদক্ষেপ নেননি। তবে কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পেছনে আদর্শিক অবস্থানের চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যপ্রণালিই বেশি দায়ী—যেখানে ক্যারিয়ার কূটনীতিকরা একপাশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং জটিল কোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার মতো সক্ষমতা বা সময় রাখা হয়নি।অক্টোবরে নিজের হেলিকপ্টারের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুতিনের এক বছরের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবকে ট্রাম্প ‘ভালো ধারণা’ বললেও, এরপর আর কোনো আলোচনা হয়নি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার বলেন, ট্রাম্প পরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং আবারও এমন একটি নতুন চুক্তির আহ্বান জানান, যাতে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।রুবিও বলেন, ‘২১ শতকে প্রকৃত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চাইলে চীনকে অন্তর্ভুক্ত না করে তা অসম্ভব—কারণ তাদের পরমাণু ভাণ্ডার দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বাড়ছে।’চীনের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত বাড়ছে। আনুমানিক ৫৫০টি কৌশলগত পরমাণু উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা তাদের রয়েছে, যা নিউ স্টার্ট চুক্তির অধীনে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত ৮০০টির সীমার তুলনায় এখনো কম। চুক্তিবদ্ধ মার্কিন মিত্র ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সম্মিলিতভাবে আরও প্রায় ১০০টি রয়েছে।
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেও চীনকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে নিউ স্টার্ট মেয়াদোত্তীর্ণ হতে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সে সময় এক মার্কিন আলোচক এমনকি চীনের পতাকা লাগানো একটি খালি চেয়ারও বৈঠকে রেখে দিয়েছিলেন।আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিমবল, যাঁরা পরমাণু ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে থাকেন, একমত হন যে চীনের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় আসা উচিত। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ট্রাম্প আদৌ সে চেষ্টা করেছেন কি না।
কিমবল বলেন, ‘চীনকে আলোচনায় আনার কথা ট্রাম্প বারবার বললেও, ২০২৫ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ঝুঁকি কমানো বা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রস্তাব তিনি বা তাঁর দল দিয়েছে—এমন কোনো ইঙ্গিত নেই।’২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে হারানোর পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার সঙ্গে নিউ স্টার্ট চুক্তি পাঁচ বছরের জন্য বাড়াতে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু পরে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়।
২০১০ সালে প্রাগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় উভয় পক্ষের মোতায়েন করা কৌশলগত পরমাণু ওয়ারহেডের সংখ্যা সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৫০-তে সীমাবদ্ধ ছিল—যা ২০০২ সালে নির্ধারিত আগের সীমা থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
সূত্র: ওয়াশিংটন থেকে এএফপি এ খবর জানায়।