
আজ থেকে ছয় বছর আগে, ২০১৯ সালের মার্চ মাসে, আমরা এক অমূল্য রত্নকে হারিয়েছিলাম। বাংলাদেশ মানবাধিকার ফেডারেশন ও বাংলাদেশ জাগ্রত পরিষদের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান, আমার প্রিয় সাথী আজিজুল হক চৌধুরী খোকন, চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর মৃত্যু আমাদের কাছে শুধু একটি শোকের খবর নয়, বরং একটি গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা কখনো পূর্ণ হবে না। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে, আমি ফিরে দেখি সেই দিনগুলোর দিকে, যখন আমরা একত্রে আন্দোলন করেছি, লড়াই করেছি, এবং স্বপ্ন দেখেছি নতুন এক চট্টগ্রাম ও দেশ গড়ার। ১৯৯০ সালের সেই উত্তাল দিনগুলো মনে পড়ছে। তখন চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের প্রথম দিনের অগ্নিপরীক্ষা শুরু হয়েছিল। তাঁর সাথে ছিলাম আমি। তিনি ছিলেন আমার এক অপরিহার্য সহযোগী, যিনি রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো ব্যবধান ছাড়াই সকলের পাশে দাঁড়াতেন। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ডিসি রোডের ছোট্ট ইলেকট্রিক দোকানে তাঁর সাথে অনেক সময় কাটিয়েছি, যখন তিনি ব্যবসা ছেড়ে মানবিক কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল মানুষের জন্য কাজ করা, সমাজে পরিবর্তন আনা, এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা। আমরা একসাথে রাজপথে নেমেছি, প্রতিবাদ জানিয়েছি। তাঁর নিরলস পরিশ্রম, তার নিঃস্বার্থ নেতৃত্ব, আমাদের কাছে ছিল এক অনুপ্রেরণা।
আজিজুল হক চৌধুরী খোকন ছিলেন সেই মানুষ, যিনি কখনো স্বার্থের জন্য তার আদর্শ বিকিয়ে দেননি। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা ব্যক্তিগত লাভের জন্য কখনো পিছপা হননি। তাঁর মন ছিল মানুষের জন্য, তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তাঁর ত্যাগ এবং সংগ্রামের পথ, আমরা যারা তাঁর সাথী ছিলাম, তা কখনো ভুলব না। তাঁর সাহসিকতা, নির্ভীকতা, দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে তিনি আমাদের সামনে ছিলেন। একদিকে তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক নেতা, অন্যদিকে তিনি ছিলেন একজন সমাজসেবক, যিনি মানুষের পক্ষে সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন। আজিজুল হক চৌধুরী খোকন শুধু একটি নাম নয়, তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। তাঁর স্মৃতি আজও আমাদের মধ্যে বেঁচে আছে, এবং তার আদর্শ আমাদের পথ দেখাচ্ছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলন, মানবাধিকার আন্দোলন, আমাদের লড়াই—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিক। তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য ছিল এক কঠিন আঘাত, কিন্তু তাঁর সংগ্রাম, তাঁর আদর্শ আজও আমাদের মধ্যে প্রেরণা হয়ে বেঁচে আছে।
আজিজুল হক চৌধুরী খোকন যেদিন আমাদের ছেড়ে চলে যান, সেদিন তার আদর্শের একটি বিরাট অংশ আমাদের মাঝে থেকে গেছে। হয়তো আজ তাঁর স্মরণে যে দোয়া মাহফিল এবং স্মরণসভা আয়োজিত হচ্ছে, তা শুধু তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, বরং তার অবদান ও সংগ্রামের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। আমরা শপথ নিয়েছি, তাঁর যে স্বপ্ন ছিল, তা আমরা পূর্ণ করব। চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমাজের জন্য কাজ করা, মানবাধিকার রক্ষা—এই সবকিছুই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
তার বাড়ি লোহাগাড়া, এবং তিনি প্রথম জীবনে ডিসি রোডে থাকতেন। পরে তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির কোতোয়ালি থানা শাখার সভাপতি ছিলেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল শুধু রাজনৈতিক নয়, মানবিকও ছিল। তাঁর সংগ্রাম, তাঁর লড়াই, তাঁর সাহস, আজও আমাদের মধ্যে জীবিত রয়েছে।
আমি যখন ফেইসবুকে সাংবাদিক কামাল হোসেনের একটি পোস্ট দেখি, তখন তাঁর স্মৃতি আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। আমি আজ এই ছোট্ট লেখা দিয়ে তাকে স্মরণ করছি, কারণ আজিজুল হক চৌধুরী খোকন এমন একজন নেতা ছিলেন, যিনি কেবল মানুষের অধিকার রক্ষায় নয়, বরং মানবিক দায়িত্ব পালনে তার জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। আমরা তাকে আজীবন মনে রাখব, একজন সমাজ ও মানবাধিকার কর্মী হিসেবে। তার মৃত্যু ছিল একটি গভীর শোক, কিন্তু তাঁর আদর্শ আমাদের সাথে থাকবে চিরকাল।
আজিজুল হক চৌধুরী খোকন, আপনি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। আমাদের সংগ্রাম, আমাদের ইতিহাস, আমাদের স্মৃতি—আপনার নাম ছাড়া কখনো পূর্ণ হবে না।