
অভীক্ষাপদ প্রণয়নে ব্লুম ট্যাক্সোনমির ধারণার ব্যবহার: প্রাথমিক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বাংলা ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের আলোকে
আবুল কালাম আজাদ,চাটখিল –সোনামুড়ী,নোয়াখালী :
শিক্ষা কেবল তথ্য মুখস্থ করানোর প্রক্রিয়া নয়; বরং শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বিকাশের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এ লক্ষ্য অর্জনে পাঠদান ও মূল্যায়নকে একই সূত্রে গাঁথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক যত দক্ষতার সঙ্গে পাঠদান করবেন, ততটাই দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষার্থীর শিখন মূল্যায়ন করতে হবে। এই মূল্যায়নের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হলো অভীক্ষাপদ (Test Item)।অভীক্ষাপদ এমনভাবে তৈরি করতে হয় যাতে শিক্ষার্থীর শিখনফল যথাযথভাবে পরিমাপ করা যায়। একটি ভালো অভীক্ষাপদ শুধু মুখস্থ জ্ঞান যাচাই করে না; বরং শিক্ষার্থীর অনুধাবন, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং সৃজনশীল চিন্তাশক্তিও যাচাই করে। এ ক্ষেত্রে ব্লুম ট্যাক্সোনমি বিশ্বব্যাপী একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো। প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বাংলা এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে অভীক্ষাপদ প্রণয়নের সময় ব্লুম ট্যাক্সোনমি অনুসরণ করলে প্রশ্নগুলো আরও মানসম্মত, শিখনফলভিত্তিক এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক হয়। ফলে মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর প্রকৃত অর্জন নির্ণয় করা সম্ভব হয়। অভীক্ষাপদের ধারণা অভীক্ষাপদ হলো এমন একটি মূল্যায়ন প্রশ্ন বা কাজ, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট শিখনফল অর্জনের মাত্রা যাচাই করা হয়। এটি লিখিত, মৌখিক, ব্যবহারিক অথবা পর্যবেক্ষণভিত্তিক হতে পারে। একটি ভালো অভীক্ষাপদের বৈশিষ্ট্য হলো— শিখনফলভিত্তিক হতে হবে। ভাষা সহজ, স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হতে হবে। শিক্ষার্থীর বয়স ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। নির্ভরযোগ্য ও বৈধ হতে হবে।বিভিন্ন জ্ঞানীয় স্তর পরিমাপ করতে সক্ষম হতে হবে।ব্লুম ট্যাক্সোনমির ধারণা শিক্ষাবিদ বেনজামিন এস. ব্লুম ১৯৫৬ সালে শিক্ষার উদ্দেশ্যকে বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত করেন। এই শ্রেণিবিন্যাসই ব্লুম ট্যাক্সোনমি নামে পরিচিত। পরবর্তীতে ২০০১ সালে অ্যান্ডারসন ও ক্রাথওয়োল এটি সংশোধন করেন। সংশোধিত ব্লুম ট্যাক্সোনমির জ্ঞানীয় ক্ষেত্রের ছয়টি স্তর হলো— ১. স্মরণ (Remember)২. অনুধাবন (Understand)৩. প্রয়োগ (Apply)৪. বিশ্লেষণ (Analyze)৫. মূল্যায়ন (Evaluate)৬. সৃজন (Create) এই ছয়টি স্তর অনুসরণ করে অভীক্ষাপদ তৈরি করলে সহজ থেকে জটিল চিন্তন দক্ষতা পর্যন্ত মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়। ব্লুম ট্যাক্সোনমির প্রতিটি স্তরের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ১. স্মরণ (Remember) এই স্তরে শিক্ষার্থী পূর্বে শেখা তথ্য স্মরণ করে উত্তর দেয়। উদাহরণ (বাংলা): কবিতাটির কবির নাম লেখ। ‘অরণ্য’ শব্দের অর্থ লিখ। উদাহরণ (বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়): বাংলাদেশের জাতীয় ফুলের নাম কী? স্বাধীনতা দিবস কত তারিখে পালিত হয়? ২. অনুধাবন (Understand) এ স্তরে শিক্ষার্থী বিষয়টি নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে। উদাহরণ (বাংলা): গল্পটির মূলভাব নিজের ভাষায় লেখ। কবি কেন প্রকৃতিকে ভালোবেসেছেন, ব্যাখ্যা কর। উদাহরণ (বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়): গাছ পরিবেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বলতে কী বোঝ? ৩. প্রয়োগ (Apply) শেখা জ্ঞান বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যবহার করার সক্ষমতা যাচাই করা হয়। উদাহরণ (বাংলা): প্রদত্ত শব্দ দিয়ে একটি অর্থপূর্ণ বাক্য রচনা কর। বিরামচিহ্ন ব্যবহার করে অনুচ্ছেদটি শুদ্ধভাবে লেখ। উদাহরণ (বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়): পানি অপচয় রোধে তুমি কী কী করবে? বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখতে তোমার করণীয় লিখ। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বিষয়ে ব্লুম ট্যাক্সোনমির ব্যবহার বাংলা বিষয়ের মূল লক্ষ্য হলো ভাষা দক্ষতা, পাঠবোধ, ব্যাকরণ, সৃজনশীলতা ও যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করা। তাই প্রশ্ন এমন হতে হবে যাতে শুধু মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং ভাষা ব্যবহারের দক্ষতাও মূল্যায়িত হয়। উদাহরণ হিসেবে— স্মরণ: কবিতার নাম লেখ। অনুধাবন: কবিতার মূলভাব ব্যাখ্যা কর। প্রয়োগ: কবিতার ভাব অনুসরণ করে দুটি বাক্য লেখ। বিশ্লেষণ: গল্পের প্রধান চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ কর। মূল্যায়ন: গল্পের নায়কের সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক কি না—মতামত দাও। সৃজন: গল্পের ভিন্ন একটি সমাপ্তি লেখ। এভাবে একই পাঠ থেকে বিভিন্ন স্তরের অভীক্ষাপদ তৈরি করলে শিক্ষার্থীর জ্ঞানীয় বিকাশ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়।