কক্সবাজারে অনুমোদনহীন হোটেল রিসোর্টে শিগগিরই অভিযান!
মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ আমিন, কক্সবাজার
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই চলছে পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই নেই অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। কোথাও কোথাও ভবন নির্মাণের জন্যও নেওয়া হয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পর্যটকদের আবাসন ও বিনোদনের জন্য গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস, রিসোর্ট ও কটেজ। বিশেষ করে মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটুয়ারটেক, ইনানী ও হিমছড়ি এলাকায় কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনার অনেকগুলোর নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদন ছাড়াই অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।
জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলা শহর, রামুর পেচারদ্বীপ, উখিয়ার ইনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় এক হাজার হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সঠিক সংখ্যা ও অনুমোদনের অবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, সমিতির তালিকাভুক্ত অধিকাংশ হোটেলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে। তবে জেলার বেশির ভাগ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই। নিয়মনীতি না মানায় এসব প্রতিষ্ঠানকে সমিতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে। আমাদের সমিতির বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সবাইকে নিয়মের আওতায় আনতে পারলে পর্যটনশিল্পের বিকাশের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরে মাত্র ৫০টি হোটেল তাদের ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন করেছে। নতুন করে আবেদন জমা পড়েছে সর্বোচ্চ ১০০টি। অথচ আগে প্রায় ২০০টি হোটেলের লাইসেন্স ছিল। এ কারণে অনেক হোটেল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
জনবলসংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা কঠিন বলে জানান তিনি। তার মতে, ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন যাচাই করলে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান ফায়ার লাইসেন্স নিতে বাধ্য হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপপরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ বলেন, জেলায় অপরিকল্পিতভাবে অনেক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঠিক পরিসংখ্যানও নেই। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ‘টুপটুপ রিসোর্টে দুর্ঘটনা ঘটার আগে আমরা দুইবার নোটিশ দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা সতর্ক হয়নি এবং অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা নেয়নি। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও সচেতন হতে হবে। তা না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুধু অগ্নিনিরাপত্তা নয়, অনেক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁয় যথাযথ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থারও ঘাটতি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ মোর্শেদ বলেন, জেলায় সর্বোচ্চ ৫০টি হোটেলের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না থাকায় গত এক বছরে ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায় অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করা হয়েছে।
তিনি জানান, সাধারণত ২০ কক্ষের কম আবাসিক হোটেল এবং ৩০ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে পরিবেশগত ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয় না। কিছু ব্যবসায়ী এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদের প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি রাশেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অথচ জেলায় কতটি আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে, তার সঠিক হিসাবও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
তিনি বলেন, অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ছাড়াই কীভাবে এত প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ব্যবসা পরিচালনা করছে, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত হওয়া উচিত।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হোটেলগুলোর মালিকদের বৈধতা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন, কউক ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে অবৈধ হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হবে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসীম উদ্দীন বলেন, অনুমোদনহীন হোটেলগুলোর কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জনবলসংকটের কারণে সময়মতো অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব না হলেও তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আব্দুল্লাহ্ আল-মামুন, নির্বাহী সম্পাদক : রাবেয়া সিরাজী, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ শাহজালাল,
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ: ২ আর কে মিশন রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১২০৩।
𝐌𝐨𝐛𝐢𝐥𝐞 : 𝟎𝟏𝟕𝟗𝟔-𝟕𝟕𝟕𝟕𝟓𝟑, ইমেইল: bhorerawajbd@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত