মেঘনায় ১৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত !
সীমানা বিরোধের বলি চার সন্তানের জননী, সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক
মোহাম্মদ আবুল কাশেম সরকার, মেঘনা (কুমিল্লা)
সীমানা বিরোধ মেটাতে ২০০৮ সালে জেলা প্রশাসনের সভায় নেওয়া হয়েছিল সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত—সিএস ম্যাপের ভিত্তিতে পুনঃজরিপ, প্রয়োজন অনুযায়ী বিএস জরিপ সংশোধন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় সীমানা পিলার স্থাপন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কেটে গেছে ১৮ বছর। এরই মধ্যে মেঘনা ও তিতাস উপজেলার মানুষের মধ্যে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ রূপ নিয়েছে সংঘর্ষে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। সর্বশেষ প্রাণ হারিয়েছেন চার সন্তানের জননী কুহিনূর আক্তার।
এখন স্থানীয়দের প্রশ্ন—১৮ বছর আগে জেলা প্রশাসনের নেওয়া সিদ্ধান্ত সময়মতো বাস্তবায়ন হলে কি কুহিনূর আক্তারের প্রাণহানি এড়ানো যেত?
কুমিল্লার মেঘনা ও তিতাস উপজেলার কয়েকটি মৌজার সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে ২০০৮ সালে জেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এসএ শাখার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ সালের স্মারক ও সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনায় এর সত্যতা পাওয়া যায়।
নথি অনুযায়ী, মেঘনা উপজেলার ১৪৬ নম্বর ব্রাহ্মণচর এবং তিতাস উপজেলার ২০৭ নম্বর মোহনপুর ও ১৫০ নম্বর দক্ষিণ সাতানি মৌজার সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিএস ম্যাপের ভিত্তিতে পুনঃজরিপ, প্রয়োজন অনুযায়ী বিএস জরিপ বাতিল বা সংশোধন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় সীমানা পিলার স্থাপনের সুপারিশ করা হয়।
অর্থাৎ, সীমানা বিরোধের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রশাসনিকভাবেই প্রায় দুই দশক আগে একটি পথনকশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের অপেক্ষাতেই রয়ে গেছে।
সিদ্ধান্তের পরও কাটেনি জটিলতা
২০০৮ সালের সিদ্ধান্তের পরও সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। পরবর্তী সময়ের প্রশাসনিক নথিতেও বিষয়টি ঝুলে থাকার প্রমাণ রয়েছে। জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস, কুমিল্লা জোনের এক চিঠিতে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মৌজাগুলোর সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর ২০১০ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিতাস উপজেলা ভূমি অফিস থেকেও জানানো হয়, তিতাস উপজেলার চরকাঠালিয়া প্রকাশ্য চরবাটেরা গ্রামের বাসিন্দাদের বন্দোবস্তকৃত ভূমি মেঘনা উপজেলায় হওয়ায় তাঁদের দখল বুঝিয়ে দেওয়ার কার্যক্রমে জটিলতা রয়েছে।
অর্থাৎ, জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দুই বছর পরও মাঠপর্যায়ে সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এরপর পেরিয়ে গেছে আরও এক যুগেরও বেশি সময়। কিন্তু সীমানা বিরোধের অবসান ঘটেনি।
সীমানা বিরোধ থেকে সংঘর্ষ, ঝরল রক্ত!
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং সীমানা নির্ধারণে কার্যকর উদ্যোগের অভাবেই বিরোধ বছরের পর বছর জটিল হয়েছে। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
গত ১৬ জুন দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৪০ জন আহত হন। এর কিছুদিন পর ২৬ জুলাই মেঘনা উপজেলার চর বিনোদপুর এলাকায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হন ৩৮ বছর বয়সী কুহিনূর আক্তার। তিনি ওই গ্রামের কাবিল মিয়ার স্ত্রী এবং চার সন্তানের জননী। ওই ঘটনায় আরও অন্তত ৩০ জন আহত হন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তিতাস উপজেলার চরকাঠালিয়া, প্রকাশ্য চরবাটেরা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমানা বিরোধের জেরেই হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সময়মতো পিলার হলে এত বড় বিরোধ হতো না’
সাবেক ইউপি সদস্য জালাল উদ্দীন ও স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর বলেন, জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। বিষয়টি বহু বছর ধরেই প্রশাসনের নথিতে রয়েছে। সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে সভা করে সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল।
তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস ও সেটেলমেন্ট দপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও বাস্তবে স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাঁরা বলেন, প্রশাসন সময়মতো সীমানা নির্ধারণ করে পিলার স্থাপন করলে দুই উপজেলার মানুষের মধ্যে বিরোধের সুযোগ অনেকটাই কমে যেত। তাঁদের প্রশ্ন—একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১৮ বছর সময় লাগবে কেন? এই দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে একজন নারী প্রাণ হারালেন, আহত হলেন অর্ধশতাধিক মানুষ। এর দায় নেবে কে?
স্যার, আমি গরিব মানুষ, মনে হয় বিচার পাইতাম না’
নিহত কুহিনূর আক্তারের স্বামী কাবিল মিয়া এখনো স্ত্রী হত্যার বিচার নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। ফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘স্যার, আমি গরিব মানুষ। আমার মনে হয়, আমি বিচার পাইতাম না। মামলা করার দিন চারজন ও পরদিন আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। শুনেছি, ৪১ জন আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে গেছে। আসামিদের টাকা-পয়সা আছে, তাই তারা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। আপনারা আমার জন্য একটু দয়া করেন স্যার।’এ কথা বলার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।
৬১ আসামির ৮ জন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে
কুহিনূর আক্তার হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সাঈদ সানাউল্লাহ বলেন, মামলার এজাহারভুক্ত ৬১ আসামির মধ্যে আটজন এখনো গ্রেপ্তার হননি। তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশ নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গত ২৫ আগস্ট ৪১ জন আসামি হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন। এ ছাড়া পাঁচজন কারাগারে এবং আরও সাতজন জামিনে মুক্ত রয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘সেদিন আমি হাইকোর্টে যাওয়ার আগেই আসামিরা সেখানে চলে যান। এ কারণে তাঁদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পরে জানতে পেরেছি, হাইকোর্ট তাঁদের ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়েছেন।’
মেঘনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, আসামিদের বাড়ি বিভিন্ন এলাকায় হওয়ায় তাঁদের গ্রেপ্তারে সংশ্লিষ্ট থানার সহযোগিতা নিতে হচ্ছে। নদী পার হয়ে ওই এলাকায় যেতে হয়। এরপরও আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, জামিনে থাকা আসামিরাও সাময়িক সময়ের জন্য জামিনে থাকলেও তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে।
নতুন করে উদ্যোগের কথা প্রশাসনের
মেঘনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী আক্তার বলেন, বিষয়টি দীর্ঘদিনের এবং এর সঙ্গে ভূমি জরিপ, মৌজা সীমানা নির্ধারণ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যক্রম জড়িত। ২০০৮ সালে সীমানা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি বলেন, এ অবস্থায় বিষয়টি নতুন করে সভায় উপস্থাপনের মাধ্যমে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি করা জরুরি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে তিতাস উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে সমন্বয় এবং সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শনের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইউএনও আরও বলেন, বিষয়টি নিষ্পত্তিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে উভয় উপজেলার সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপও বিশেষভাবে জরুরি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সীমানা বিরোধের স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি এলাকায় যাতে এ ধরনের বিরোধকে কেন্দ্র করে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আর কত রক্ত ঝরলে মিলবে স্থায়ী সমাধান?
২০০৮ সালে জেলা প্রশাসনের সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ১৮ বছর পরও যদি সীমানা বিরোধের সমাধান না হয়, আর সেই বিরোধের জেরে একের পর এক সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে—তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এত দীর্ঘসূত্রতা কেন?
চার সন্তানের জননী কুহিনূর আক্তারের মৃত্যু সেই প্রশ্নকেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয়দের এখন একটাই প্রশ্ন—আর কত রক্ত ঝরলে মেঘনা-তিতাসের সীমানা বিরোধের স্থায়ী সমাধান হবে?
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আব্দুল্লাহ্ আল-মামুন, নির্বাহী সম্পাদক : রাবেয়া সিরাজী, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ শাহজালাল,
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ: ২ আর কে মিশন রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১২০৩।
𝐌𝐨𝐛𝐢𝐥𝐞 : 𝟎𝟏𝟕𝟗𝟔-𝟕𝟕𝟕𝟕𝟓𝟑, ইমেইল: bhorerawajbd@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত