
গাজীপুরে ঝুট সিন্ডিকেটের তাণ্ডব: প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া ও সাংবাদিক হত্যাচেষ্টার অভিযোগ!
এমদাদুল হক
শিল্পনগরী গাজীপুরে পোশাক কারখানার কোটি কোটি টাকার ঝুট ব্যবসা এখন অপরাধ জগতের এক বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতার রদবদল হলেও ঝুট ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত ও সহিংসতা কমেনি। বরং স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পারস্পরিক সমঝোতা ও আঁতাতের অভিযোগকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
গত ১৩ আগস্ট ২০২৬, ড্যাগেরচালা ফকির মার্কেট এলাকায় ‘ইনডেসোর’ (ইন্টারস) গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা দখলকে কেন্দ্র করে দিনদুপুরে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে দুই পক্ষের সশস্ত্র লোকজন রামদা, চায়নিজ কুড়াল, লোহার রড ও পাইপ নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে মাত্র দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে থানা থাকা সত্ত্বেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া চললেও তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
সাংবাদিকের ওপর নৃশংস হামলা ও জীবনের ঝুঁকি অস্ত্রের এই মহড়ার ভিডিওচিত্র ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন গাছা থানা প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক এবং ‘দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ’-এর গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি শরীফ ওমর টুটুল। অভিযোগ রয়েছে, সন্ত্রাসীরা তাঁকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর আহত করে ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে যায়। পরে তাঁকে উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে। ভিডিওতে হামলাকারীদের শনাক্তের দাবি।
ঘটনার পর কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও এবং ঘটনার ভিডিও ফুটেজে অস্ত্রধারীদের চেহারা দেখা যাওয়ার দাবি করা হলেও, মামলার প্রধান অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার দিন সকালেই প্রভাবশালী একটি পক্ষের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশ বা সমঝোতার কারণে তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মাঠে নামার সাহস পেয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ্যে আসা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিক শরীফ ওমর টুটুল নিজে বাদী হয়ে গাছা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটির নম্বর ২৪ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর অভিযোগ, হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে মূল ঘটনার গতিপথ ভিন্ন দিকে নেওয়া এবং অভিযুক্তদের চাপমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে পাল্টা অভিযোগ ও মামলা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। মোছা. শারমিন আক্তার নামের এক নারী গাছা থানায় অপর পক্ষের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তাঁর স্বামী মিন্টু সরকার, যিনি গাছা থানা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে পরিচিত, এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে ৭ লাখ ১৬ হাজার টাকা লুটের অভিযোগও করা হয়েছে। অন্যদিকে মোছা. আঞ্জুয়ারা নামের অপর এক নারীও গাছা থানায় পৃথক একটি অভিযোগপত্র দিয়েছেন বলে জানা গেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, আতাউড় এন্টারপ্রাইজের পাইকারি দোকানে হামলা চালিয়ে ২৫ লাখ টাকার বেশি লুটপাট করা হয়েছে।
তবে এসব পাল্টা অভিযোগের সত্যতা এবং মূল ঘটনার সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। ঘটনার দিন থানা থেকে মাত্র দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া চলার অভিযোগ থাকলেও পুলিশ কেন দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। আরও বড় প্রশ্ন, একজন সাংবাদিক গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় এবং ঘটনার ভিডিওচিত্র থাকার দাবি সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তারা কীভাবে থানায় গিয়ে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ পাচ্ছেন—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গাজীপুরের ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, দখল ও আধিপত্য বিস্তারের নানা অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনায় সেই পুরোনো সমস্যাই নতুন করে সামনে এসেছে। সাংবাদিক শরীফ ওমর টুটুলের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং পাল্টা অভিযোগগুলোরও সুষ্ঠু তদন্ত করা জরুরি।
একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, পক্ষপাত বা কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে, তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। গাজীপুরের ঝুট ব্যবসাকে ঘিরে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব ও সংঘাত বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ এবং সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।