
সোনারগাঁয়ে প্রবাসফেরত সন্তানের নির্মমতা: রক্ত পানি করা টাকায় বিদেশ পাঠানো মাকেই রড দিয়ে পিটিয়ে ঘরছাড়া, লুটে নিল সঞ্চয়!
আনিসুর রহমান সোনারগাঁও
মায়ের ভালোবাসার কোনো হিসাব হয় না। নিজের মাথার ওপরের ছাদ বিক্রি করেও সন্তানকে মানুষ করতে চান একজন মা। কিন্তু সেই মায়ের বুকের রক্তে গড়া স্বপ্নই যখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানবতাও যেন লজ্জায় মুখ লুকায়। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম দিয়েছে এক প্রবাসফেরত ছেলে, যে জন্মদাত্রী মায়ের গায়ে লোহার রড তুলতেও একবার ভাবেনি।
অভিযোগ উঠেছে, জমি বিক্রি, এনজিও থেকে ঋণ এবং ধার করা টাকা মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় করে বড় ছেলে ফাহিম মোস্তাকিম আলভীকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলেন মা ফাতেমা আক্তার (৪৫)। স্বপ্ন ছিল, ছেলে প্রতিষ্ঠিত হবে, সংসারের দুঃখ ঘুচবে। কিন্তু প্রবাস থেকে ফিরে সেই ছেলেই মায়ের রক্ত ঝরিয়ে ঘরছাড়া করেছে। শুধু তাই নয়, মায়ের জমানো নগদ টাকাও লুটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও থানার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের শুকুরদী (বড়বাড়ী) এলাকায়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ফাতেমা আক্তার বাদী হয়ে নিজের ছেলে ফাহিম মোস্তাকিম আলভী (২৬), পুত্রবধূ সুমাইয়া আক্তার (২৪), দেবর ফয়সাল আহমেদ সুমন (৩৫) এবং দেবরের স্ত্রী আরজুদা (২৫)-এর বিরুদ্ধে সোনারগাঁও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ফাতেমা আক্তার প্রায় দুই বছর আগে জমি বিক্রি ও এনজিওর কিস্তির টাকা মিলিয়ে প্রায় ৭ লাখ টাকা খরচ করে বড় ছেলে আলভীকে সৌদি আরব পাঠান। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পর থেকেই আলভীর আচরণ পাল্টে যায়। অভিযোগ রয়েছে, স্ত্রী ও দেবরের প্ররোচনায় পড়ে সে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় এবং দীর্ঘ দেড় বছর কোনো ভরণপোষণও পাঠায়নি। ফলে ছোট ছেলে ফারদিনকে নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাতে হয় অসহায় মাকে।
এরই মধ্যে সৌদি আরবে আলভী অবৈধ (আকামাবিহীন) হয়ে পড়লে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আবারও বিপুল অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হয়। সন্তানের বিপদের কথা শুনে আবারও সবকিছু ভুলে যান মা। এনজিও থেকে ঋণ নেন, চাচাতো ভাই হাসানের কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা ধার করেন এবং প্রায় ৩ লাখ টাকা সৌদিতে পাঠিয়ে দেড় মাস আগে ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনেন।
কিন্তু দেশে ফেরার পরই নেমে আসে ভয়াবহ নির্যাতন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৪ জুলাই রাত প্রায় ১১টার দিকে চাচাতো ভাই হাসান পাওনা টাকা চাইতে এলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে আলভী। একপর্যায়ে আলভী ও তার সহযোগীরা লোহার রড দিয়ে হাসানের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে গুরুতর আহত করে। ভাইকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে মা ফাতেমা আক্তারকেও নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। লোহার রডের আঘাতে গুরুতর জখম হন তিনি।
এতেই শেষ হয়নি নির্যাতন। অভিযোগ রয়েছে, হামলার পর ঘরের ওয়ারড্রব থেকে নগদ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। এরপর রক্তাক্ত অবস্থাতেই জন্মদাত্রী মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় সোনারগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন তিনি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ছোট ছেলে ফারদিনকে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে নিজের কাছে আটকে রেখেছে আলভী। ফলে একদিকে সন্তানকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে নিজের ঘর থেকে বিতাড়িত হয়ে এক কাপড়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন নির্যাতিত মা।
ফাতেমা আক্তার অভিযোগ করেন, চিকিৎসা শেষে বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করলে তাকেও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে তিনি সোনারগাঁও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তবে অভিযোগের পরও অভিযুক্তরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। থানার তলব উপেক্ষা করে তারা হাজির হয়নি। এমনকি শুক্রবার (৭ আগস্ট) আপস-মীমাংসার জন্য নির্ধারিত বৈঠকেও অভিযুক্তরা উপস্থিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় শুকুরদী এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, যে মা নিজের সর্বস্ব বিক্রি করে সন্তানকে মানুষ করেছেন, সেই মায়ের ওপর এমন বর্বরোচিত নির্যাতনের দৃষ্টান্ত সমাজের জন্য চরম লজ্জার। তারা দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ভুক্তভোগী ফাতেমা আক্তার প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ছোট ছেলে ফারদিনকে ফিরে পাওয়া এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।