বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৫৮ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
রামভদ্রপুর ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে হাজী মোসলেম হোসেন সরদারের প্রার্থিতা নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা গাজীপুরে অবৈধ ৩ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে র‍্যাব ও জেলা প্রশাসনের অভিযান মনোহরদীতে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে নবাগত ইউএনওর মতবিনিময় পলাশে গোপন বৈঠককালে গ্রেপ্তার যুবলীগ নেতা: নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপতৎপরতা রোখার হুঁশিয়ারি যুবদলের তিন মাদকসেবীকে কারাদন্ড ও হাসপাতাল সিলগালা ছাত্রদল নেতার ওপর হামলার ঘটনায় জামায়াত নেতাসহ গ্রেপ্তার-৩ মেহেন্দিগঞ্জে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির  সহ সাংগঠনিক সম্পাদক  মিজানুর রহমান সুমনের আগমন দিনাজপুরে তীব্র লোডশেডিং! অবহেলা ও অযত্নে মৃতপ্রায় খোকসার মিনি শিশু পার্ক!

নীরব বিষের নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক!

  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬

নীরব বিষের নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক: আমরা কি ধীরে ধীরে নিজেরাই নিজেদের বিষ খাওয়াচ্ছি?

শিকদার নূর ই আলম সিদ্দিকী মুরাদ

মানুষ আজ যে শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তার কোনো মুখ নেই, কোনো শব্দ নেই, কোনো রংও নেই। অথচ সে প্রতিদিন আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। আমাদের খাবারে, পানিতে, বাতাসে, এমনকি নবজাতকের জীবনধারণের প্রথম খাদ্য মায়ের বুকের দুধেও তার উপস্থিতির প্রমাণ মিলছে। এই নীরব অনুপ্রবেশকারীর নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক।

একসময় প্লাস্টিককে আধুনিক সভ্যতার বিস্ময় বলা হতো। কিন্তু সেই বিস্ময়ই আজ মানবসভ্যতার জন্য এক অদৃশ্য বিপদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। প্লাস্টিক শত শত বছরেও সহজে নষ্ট হয় না। সময়ের সঙ্গে তা ভেঙে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়, যা খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু দেখা না গেলেও তা আমাদের শরীর এড়িয়ে যাচ্ছে না।

বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা এবং মায়ের বুকের দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। বিষয়টি শুধু পরিবেশ দূষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম আলোচিত উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। যদিও এই কণাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান, তবুও এতটুকু স্পষ্ট যে এটি কোনো সুখবর নয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা নিজেরাই প্রতিদিন এই কণাগুলো গ্রহণ করছি। অফিসের প্লাস্টিকের বোতলের পানি, রাস্তার পাশের একবার ব্যবহারযোগ্য কাপ, গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে পরিবেশন, প্লাস্টিকের কন্টেইনারে খাবার গরম করা, এমনকি কিছু প্রসাধনী সামগ্রীও হতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস। সিনথেটিক কাপড়ের ক্ষুদ্র তন্তু বাতাসে ভেসে বেড়ায়, আর সেই বাতাসই আমরা প্রতিনিয়ত শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), যুক্তরাষ্ট্রের National Institutes of Health (NIH), Stanford Medicine এবং King’s College London-এর গবেষকরা এই বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তাদের পর্যবেক্ষণে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহের অন্ত্রের স্বাস্থ্য, প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা এবং হরমোনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এটিও সত্য, এখনো এমন কোনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নেই যে নির্দিষ্ট কোনো রোগের জন্য একমাত্র মাইক্রোপ্লাস্টিকই দায়ী। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সচেতনতা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও আশাব্যঞ্জক নয়। নদী, উপকূল এবং সামুদ্রিক মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে দেশীয় গবেষণা ইতোমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের দীর্ঘদিনের অবহেলা আজ জনস্বাস্থ্যের নতুন সংকট তৈরি করছে।

প্রশ্ন হলো, সমাধান কোথায়?

সমাধান আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসেই লুকিয়ে আছে। গরম খাবার প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা স্টিলের পাত্রে রাখা, প্লাস্টিকের কন্টেইনারে খাবার গরম না করা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বোতল ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন এবং সচেতন ভোক্তা হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণই হতে পারে প্রথম প্রতিরোধ।

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর পরামর্শ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে টুথপেস্ট বা ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী নিয়ে অযাচাইকৃত তথ্য মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। দন্তচিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দাঁতের সুরক্ষার জন্য কার্যকর। তাই বিজ্ঞাপনের চটক কিংবা গুজবের পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ওপরই আস্থা রাখতে হবে।

আমরা প্রায়ই বড় বড় পরিবেশগত সংকট নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু নিজের হাতে ধরা প্লাস্টিকের বোতল, অফিসের একবার ব্যবহারযোগ্য কাপ কিংবা বাজারের প্লাস্টিকের প্যাকেটও যে বৈশ্বিক সংকটের অংশ, সেটি উপলব্ধি করি না।

মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়তো আজই আমাদের অসুস্থ করে দিচ্ছে না। কিন্তু আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন পৃথিবী রেখে যাচ্ছি, সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের আজই খুঁজতে হবে।

সভ্যতার উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনকে নিরাপদ করে। যদি সেই উন্নয়নের উপকরণই ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে নীরব বিষ হিসেবে জমা হতে থাকে, তবে উন্নয়নের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত প্রতিশোধ নেয় না, সে শুধু হিসাব মেলায়।

লেখক:

একজন গণমাধ্যম কর্মী ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা প্রেসক্লাব

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews