
কালীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে, বেড়েছে মাটির দাম
জাহাঙ্গীর হোসেন, কালীগঞ্জ ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ফরিদকাটির ঐতিহ্য মৃৎশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মাটির তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা শহরের পাশাপাশি গ্রামেও কমে গেছে। মাটির অভাব এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা পাল সম্প্রদায়ের মানুষগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পালপাড়ায় আগে যে ব্যস্ততা দেখা যেতো, সে ব্যস্ততা এখন আর নেই। সারি সারি মাটির তৈজসপত্র এখন আর তেমনভাবে নজরে পড়ে না।

মাটির জিনিসপত্রের চাহিদা আগের মতো না থাকায় এর স্থান দখল করে নিয়েছে দস্তা, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের তৈজসপত্র। এমন একসময় ছিল যখন পরিবারের নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব কাজে মাটির তৈরি জিনিসের বিকল্প ছিল না। মৃৎশিল্পীরা একসময়ে শুধু নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে শুকনো খড়, লাকড়ি, মাটি, বালি ও পানির সাহায্যে তৈরি করতেন দধির পাত্র, পিঠাখোলা, ভাতের পাতিল, পাতিলের ঢাকনা, তরকারি কড়াই, রসের হাড়ি, ধুপ জ্বালানি পাত্র, মুড়ির পাতিল, বাতি জ্বালানি পাত্র,সহ শিশুদের জন্য বিভিন্ন রকমের মাটির তৈরি খেলনা।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় বাহারি ডিজাইনের প্লাস্টিক, মেলামাইন, স্টিল, বিদ্যুৎচালিত রাইস কুকার, সিরামিক ও সিলভারের জিনিস ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা কমে গেছে। যার কারণে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষের একদিকে যেমন কমে গেছে কাজের পরিধি, তেমনি কমেছে উপার্জন। জীবন-জীবিকার জন্য বাধ্য হয়ে অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত। পেশার চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় মৃৎশিল্পীদের বর্তমান প্রজন্মের কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করে রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা চালানোসহ ছোট ছোট ব্যবসায় নেমে পড়েছেন।

উপজেলার ফরিদকাটি গ্রামে প্রায় অর্ধশতাধিক পাল পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন এর সংখ্যা কমে এসেছে ।সরজমিনে দেখা যায় রায়গ্রাম ইউনিয়নের ফরিদকাঠি গ্রামে কয়েকটি পরিবার এখনও ধরে রেখেছে বাপ দাদার এই পেশা। কেউ দইয়ের পাতিল তৈরি করছেন কেউ বা হাঁড়ি-পাতিল পোড়ানোর চুলায় কাজ করছেন। এসব রোদে শুকানোসহ সব ধরণের কাজে পুরুষদের সহযোগিতা করছেন পরিবারের নারী ও শিশুরা।
মৃৎশিল্পী বিষ্ণু পাল পাল বলেন, আমাদের সংসার চালানোই কষ্টকর। এই কাজের সঙ্গে আমরা যারা রয়েছি, এক প্রকার দুঃখ-কষ্টের মধ্যেই যাচ্ছে আমাদের জীবন। সন্তানদের পড়ালেখা চালানোই কষ্টকর। একসময় বড় কলসসহ বিভিন্ন ধরনের হাঁড়ি-পাতিল ১৫-২০ প্রকার জিনিস তৈরি করা হতো। কিন্তু বাত রুমের পাট (রিং) সহ মাত্র ৫-৭ প্রকার জিনিস তৈরি করা হয়।
মৃৎশিল্পী মধু পাল জানান, একসময় তাদের গ্রামের পাশের বিভিন্ন জমি থেকে ৪০০-৫০০ টাকা গাড়ি মাটি ক্রয় করতে পারতেন। কিন্তু এখন বেড়েছে ইটের ভাটা। যে কারণে ১৫০০-২০০০ টাকা দরে এক গাড়ি মাটি কিনতে হচ্ছে। আগে খড়ি কেনা হতো ৯০-১০০ টাকা মন, বর্তমানে ৩০০ টাকা মন কিনতে হয়। অথচ মাটির তৈরি তৈজসপত্রের দাম তুলনামূলক বাড়েনি। বেশি দামে মাটি ও খড়ি কিনে এসব জিনিসপত্র তৈরি করে আগের মতো লাভ হয় না।
অমূল্য পাল বলেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান থেকে যদি আর্থিক সহায়তা দেয়া হয় তাহলে এই শিল্পটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে। অন্যথায় ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প অচিরেই হারিয়ে যাবে।