১৮ বছরেও চালু হয়নি দীঘিনালার পানি শোধনাগার, সম্ভাব্য কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকেও বঞ্চিত সরকার!
হাসান মোর্শেদ, দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি)
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন টিএনটির পেছনে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০০১ সালে একটি পানি শোধনাগার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়। ২০০৮ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলেও আজ পর্যন্ত চালু হয়নি পানি শোধনাগারটি। ফলে প্রায় দুই দশক ধরে সরকারি এই মূল্যবান স্থাপনাটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের আওতাভুক্ত শতাধিক পরিবার এখনো বিশুদ্ধ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি চালু হলে থানাপাড়া ও আশপাশের এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের নিরাপদ পানির সংকট দূর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও এটি চালু না হওয়ায় অনেক পরিবার এখনো দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করে পানীয়, রান্না ও দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
থানাপাড়ার বাসিন্দা মো. সোহেল বলেন, "প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার সময় আমরা খুবই আশাবাদী ছিলাম। মনে হয়েছিল আমাদের পানির কষ্ট শেষ হবে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত এটি চালু হয়নি।"
স্থানীয় বাসিন্দা মর্জিনা বেগম বলেন, "এখনো দূর থেকে পানি এনে সংসারের কাজ করতে হয়। এত বড় প্রকল্প থাকার পরও আমরা এর কোনো সুফল পাচ্ছি না।"
প্রকল্পসংলগ্ন বাসিন্দা ইমরান হোসেন বলেন, "প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি বছরের পর বছর ধরে অচল পড়ে আছে। এটি চালু হলে এলাকার শত শত পরিবার উপকৃত হতো। অথচ এখন সরকারি সম্পদ নষ্ট হচ্ছে।"
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় পানি শোধনাগারের বিভিন্ন অবকাঠামো ও মূল্যবান যন্ত্রাংশে মরিচা ধরেছে এবং ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। ট্রান্সফরমার, পানির মোটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম অযত্নে পড়ে রয়েছে। এছাড়া সুবিধাভোগীদের বাড়ি পর্যন্ত মাটির নিচে স্থাপন করা পাইপলাইন দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অনেকাংশে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে প্রকল্পটি চালু করতে হলে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
প্রকল্পটি দীর্ঘদিন অচল থাকায় সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকেও বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি চালু হলে প্রায় ৫০০টি পরিবারকে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হতো। প্রতিটি পরিবার থেকে মাসে ১০০ টাকা করে ফি আদায় করা হলে সরকারের মাসিক রাজস্ব আয় হতো প্রায় ৫০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে ২০০৮ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৮ বছরে সম্ভাব্য রাজস্ব আয় দাঁড়াতে পারত প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা। তবে এ হিসাব সম্ভাব্য সংযোগের সংখ্যা এবং পরিবারপ্রতি মাসিক ১০০ টাকা ফি ধরে করা হয়েছে; প্রকৃত রাজস্ব সংযোগের সংখ্যা ও নির্ধারিত ফি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দীঘিনালা উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "প্রকল্পটির কাজ ২০০৮ সালে শেষ হয়েছিল। উদ্বোধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সময় বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের কারণে প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তখন প্রকল্পটির চাহিদা ছিল, তবে বর্তমানে আগের মতো চাহিদা নেই।"
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি নির্মাণের সময়ও দায়িত্বে ছিলেন উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম এবং তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দীঘিনালা উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন। তবে বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের সমস্যা পরবর্তী সময়ে দূর হওয়ার পরও কেন প্রকল্পটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিল পারভেজ বলেন, "আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। প্রকল্পটি অনেক আগের। কেন এটি এখনো চালু হয়নি, সে বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।"
এলাকাবাসীর দাবি, জনগণের করের অর্থে নির্মিত প্রায় এক কোটি টাকার এই প্রকল্পটির কারিগরি মূল্যায়ন করে দ্রুত পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হোক, যাতে মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা পায় এবং সরকারি বিনিয়োগের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে প্রায় দুই দশক ধরে প্রকল্পটি অচল থাকার কারণ, সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয় এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা কারিগরি অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আব্দুল্লাহ্ আল-মামুন, নির্বাহী সম্পাদক : রাবেয়া সিরাজী, সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ শাহজালাল,
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ: ২ আর কে মিশন রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১২০৩।
𝐌𝐨𝐛𝐢𝐥𝐞 : 𝟎𝟏𝟕𝟗𝟔-𝟕𝟕𝟕𝟕𝟓𝟑, ইমেইল: bhorerawajbd@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত