
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি: অস্তিত্ব সংকটে দেশের স্টিল শিল্প, পূর্বমূল্য পুনর্বহালের দাবি !
সম্প্রতি ঘোষিত বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)। সংগঠনটি জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পখাত "স্টিল শিল্প" তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও বহুমাত্রিক সংকটকালের মুখোমুখি হয়েছে। বিদ্যুতের এই নতুন ট্যারিফের কারণে প্রতি মেট্রিক টন স্টিল উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১,৭৮৫ টাকা বৃদ্ধি পাবে, যা অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচসহ সর্বোচ্চ ৩,৫৬০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আজ সোমবার (৮ জুন, ২০২৬) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএ-এর পক্ষ থেকে এই দাবি ও তথ্যসমূহ তুলে ধরা হয়।সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএসএমএ-এর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি উল্লেখ করেন, স্টিল শিল্প বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগসমৃদ্ধ এই শিল্পখাত দেশের সেতু, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, আবাসন ও শিল্পকারখানা निर्माणে অপরিহার্য কাঁচামাল সরবরাহ করে। একই সঙ্গে এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত এবং সরকার প্রতিবছর এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অর্জন করে।বহুমাত্রিক সংকটে স্টিল শিল্প বিএসএমএ জানায়, বর্তমানে দেশের স্টিল শিল্প আগে থেকেই বেশ কিছু বড় সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্মাণখাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, বাজারে চাহিদা হ্রাস, উচ্চ সুদের হার, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলার সংকট, এলসি খোলার জটিলতা, কার্যকরী মূলধনের ঘাটতি,ガス সরবরাহ সংকট এবং ক্রমবর্ধমান পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় স্টিল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য টিকে থাকাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০টি আধুনিক স্টিল মিল এবং ১৫০টিরও বেশি রি-রোলিং মিল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ১২.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অথচ দেশের বর্তমান বার্ষিক চাহিদা মাত্র প্রায় ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে অধিকাংশ কারখানা বর্তমানে তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশেরও কম ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধি শিল্পখাতের ওপর আরও একটি বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চিত্র (প্রতি মেট্রিক টন): বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফের কারণে: অতিরিক্ত প্রায় ১,৭৮৫ টাকা। ভ্যাট, বন্দর চার্জ, জ্বালানি, পরিবহন ও অন্যান্য খরচসহ মোট প্রভাব: প্রায় ৩,৫৬০ টাকা পর্যন্ত। গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা অ্যাসোসিয়েশন বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, দেশের বৃহৎ স্টিল কারখানাগুলো ৩৩ কেভি, ১৩২ কেভি এবং ২৩০ কেভি হাই ও এক্সট্রা হাই ভোল্টেজ লাইনের সরাসরি গ্রাহক। স্টিল মিল মালিকগণ নিজস্ব অর্থায়নে সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার এবং প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। ফলে এসব গ্রাহকের ক্ষেত্রে কার্যতঃ কোনো উল্লেখযোগ্য সিস্টেম লস, ট্রান্সমিশন লস বা ডিস্ট্রিবিউশন লস নেই। তা সত্ত্বেও ডিমান্ড চার্জ, পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ, ভ্যাট এবং অন্যান্য চার্জের মাধ্যমে শিল্পখাতের ওপর ক্রমাগত অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।বর্তমান বাজার परिस्थितियोंতে এই অতিরিক্ত ব্যয় সম্পূর্ণরূপে उपभोक्ताओंদের ওপর স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। ফলে এর একটি বড় অংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের বহন করতে হবে। অন্যদিকে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে স্টিলের বাজারমূল্যও বৃদ্ধি পাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আবাসন, অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতে। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে।সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, দেশের মোট স্টিল ব্যবহারের প্রায় ৬০ শতাংশ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে স্টিলের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি মানেই সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয় বৃদ্ধি। অর্থাৎ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরকারকেই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন ব্যয়কে আরও বৃদ্ধি করবে।নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বানবিএসএমএ নেতারা বলেন, "আমরা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন। তবে বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত অদক্ষতা, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার আর্থিক বোঝা উৎপাদনশীল শিল্পখাতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই বা কার্যকর সমাধান হতে পারে না। এতে শিল্প উৎপাদন কমবে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং দেশের শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।"তাই দেশের শিল্প, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এবং নীতিনির্ধারকদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে বলেছে— বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করে পূর্ববর্তী মূল্যহার পুনর্বহাল করা হোক।তারা পরিশেষে বলেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পখাতকে রক্ষা করা আজ শুধু শিল্পখাতের দাবি নয়; এটি কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে একটি জরুরি জাতীয় প্রয়োজন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ শাহজালাল, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আব্দুল্লাহ্ আল-মামুন,যুগ্ম-সম্পাদক :মো. কামাল উদ্দিন,
নির্বাহী সম্পাদক : রাবেয়া সিরাজী
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ : মোতালেব ম্যানশন, ২ আর কে মিশন রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল : 01796-777753,01711-057321
ই-মেইল : bhorerawajbd@gmail.com