
গ্রিনল্যান্ড যেহেতু ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, তাই ডেনমার্কসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ শনিবার ট্রাম্পের দেওয়া হুমকির বিরুদ্ধে ‘ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর’ কথা জানিয়েছে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে না দিলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হবে।
এক যৌথ বিবৃতিতে ব্রিটেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও সুইডেন সতর্ক করে বলেছে, ‘শুল্কের হুমকি আটলান্টিকপারের সম্পর্ককে ক্ষুণ্ন করে এবং এক বিপজ্জনক নিম্নমুখী সর্পিল পরিস্থিতির ঝুঁকি তৈরি করে।’
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, ট্রাম্পের এই আল্টিমেটাম বিশ্বব্যবস্থাকে ‘আমরা যেভাবে চিনি’ সেই কাঠামোকেই হুমকির মুখে ফেলছে এবং ন্যাটো সামরিক জোটের ভবিষ্যৎও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ‘গ্রিনল্যান্ড ও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি’ নিয়ে কথা বলেছেন এবং চলতি সপ্তাহে দাভোস সম্মেলনে আবারও আলোচনা করার আশা করছেন। তবে কথোপকথনের বিস্তারিত তিনি জানাননি। ইউরোপীয় কাউন্সিল জানিয়েছে, রোববার ব্রাসেলসে ইইউ রাষ্ট্রদূতদের বৈঠকের পর আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইইউ নেতাদের একটি শীর্ষ সম্মেলন ডাকা হচ্ছে।
গত জুলাইয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি চুক্তি হয়, যার আওতায় ইইউর অধিকাংশ রপ্তানিপণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিষয়টি নির্ধারিত ছিল। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক হুমকি ওই চুক্তির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা স্পষ্ট নয়। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল এআরডি টেলিভিশনকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে এই চুক্তি সম্ভব বলে আমি মনে করি না।’
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সহযোগীরা জানিয়েছেন, ট্রাম্প যদি অতিরিক্ত শুল্ক আরোপে অগ্রসর হন, তবে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আগে কখনো ব্যবহার না করা ‘অ্যান্টি-কোয়ার্শন ইনস্ট্রুমেন্ট’ সক্রিয় করার আহ্বান জানাবেন ম্যাক্রোঁ। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ২৭ দেশের ইইউ বাজারে, যার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪৫ কোটি, পণ্য ও সেবার আমদানি সীমিত করা সম্ভব। হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প বারবার গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন।
চলতি মাসের শুরুতে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ার পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের দাবি, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এলে তা মার্কিন ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র স্বার্থে হবে।
তিনি ও তার সহযোগীরা আরও যুক্তি দিয়েছেন, ন্যাটোর সদস্য দেশ হওয়া সত্ত্বেও ডেনমার্ক রাশিয়া বা চীন যদি কখনো গ্রিনল্যান্ড আক্রমণ করে, তবে দ্বীপটিকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। এর জবাবে ডেনমার্ক ও তাদের কয়েকটি ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্র সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডে একটি সামরিক মহড়ার জন্য স্বল্পসংখ্যক সেনা পাঠিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এদিকে শনিবার গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে হাজারো মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেয়।
এর জবাবে শনিবার ট্রাম্প হুমকি দেন, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ব্রিটেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ১ জুন থেকে এই শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে এবং ‘গ্রিনল্যান্ডের সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক ক্রয় বিষয়ে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত’ তা বহাল থাকবে।
এমনকি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় মিত্রদের একজন, ইতালির কট্টর ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও এই হুমকিতে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল সফরকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আজ নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা একটি ভুল হবে বলে আমি মনে করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টা আগে আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাকে আমার মতামত জানিয়েছি।’ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, তিনি ‘যত দ্রুত সম্ভব’ ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে চান।
ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ফান উইল ট্রাম্পের এই হুমকিকে ‘অব্যাখ্যাযোগ্য’ ধরনের ‘ব্ল্যাকমেইল’ বলে আখ্যা দেন। ফ্রান্সের কৃষিমন্ত্রী আনি জেনেভার্ড সতর্ক করে বলেন, শুল্ক আরোপ করলে ওয়াশিংটনেরও ক্ষতি হবে। ইউরোপ ১ ও সি-নিউজকে তিনি বলেন, ‘এই শুল্ক বৃদ্ধির খেলায় ট্রাম্পেরও অনেক কিছু হারানোর আছে, তার নিজ দেশের কৃষক ও শিল্পপতিদেরও।’
নরওয়ে জানিয়েছে, তারা আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে না। দেশটি ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির লক্ষ্যবস্তু হলেও ব্রিটেনের মতো ইইউর সদস্য নয়। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরে এনআরকে টেলিভিশনকে বলেন, ‘বাণিজ্য যুদ্ধ এড়াতে থেমে ভেবে দেখা দরকার, কারণ তা একটি নিম্নমুখী সর্পিল পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাবে। কেউই এতে জয়ী হবে না।’
সূত্র: ব্রাসেলস থেকে এএফপি জানায় ।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ শাহজালাল, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আব্দুল্লাহ্ আল-মামুন,যুগ্ম-সম্পাদক :মো. কামাল উদ্দিন,
নির্বাহী সম্পাদক : রাবেয়া সিরাজী
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ : মোতালেব ম্যানশন, ২ আর কে মিশন রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল : 01796-777753,01711-057321
ই-মেইল : bhorerawajbd@gmail.com