অসুস্থ্য মায়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নেয়া ঋণের দায় থেকে মুক্তি পেতে ঘর বাড়ি বিক্রি করেও শেষ রক্ষা হয়নি বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সুন্দরদীগ্রামের ব্যবসায়ী সহোদর যুবক রিপন মিত্র ও সুমন মিত্রের।আপন চাচার ষড়যন্ত্রে মন্দির ভাঙ্গার অপবাদ নিয়ে দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছেন ওই ব্যবসায়ী যুবকদ্বয়। একই সাথে নানা রকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী, ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার টরকী বন্দর ভিক্টোরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পেছনে এস.এ রেকর্ডিয় জেএল ৬৩ নং সুন্দরদী মৌজার ১০৪৫ নং খতিয়ানের ১৯৩৪ নন দাগের ৮১ শতক ভূমির উপরে গড়া বাড়িসহ ওই মৌজার ৭/৮ একর ভূমির রেকর্ডীয় মালিক ছিলেন হরিমোহন মিত্র ও কিশোরী মোহন মিত্র । এর মধ্যে কিশোরী মোহন মিত্র অবিবাহিত অবস্থায় মারা যান। এরপর হরিমোহন মিত্র মারা গেলে 77-g(1x-1)75- 76 মিউটেশন কেসের মাধ্যমে বাবা হরিমোহন মিত্র ও চাচা কিশোরী মোহন মিত্রের সমুদয় ভূমির মালিক হন হরি মোহন মিত্রের একমাত্র পুত্র মনোরঞ্জন মিত্র। তিনি বাড়িতে একটি দূর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু মন্দিরের নামে তিনি কোন ভূমি দান করেননি। ফলে বছরের পর বছর ধরে মন্দিরটিতে পূজা পালন হলেও সেটি তাদের পারিবারিক মন্দির হিসেবে থেকে যায়। ১৯৯০ সালের ৭ মে মনোরঞ্জন মিত্র মারা যান। এরপর তার সমুদয় সম্পত্তির মালিক হন তার তিন ছেলে ব্রজ বিলাস মিত্র, নারায়ণ চন্দ্র মিত্র ও স্বপন কুমার মিত্র। তারা তিন ভাই মিলে বিভিন্ন সময়ে বাড়িরবাইরের অবশিষ্ট ভূমি বিক্রি করে ফেলেন। তাদের থাকে শুধু ৮১ শতক ভূমির উপরে করা বাড়িটি। হিস্যা অনুযায়ী তিন ভাইয়ের এক এক ভাই ওই বাড়ির ২৭ শতক্ করে ভূমি ভাগে পান । এরমধ্যে স্বপন মিত্র ১৯৯৫ সালে তার পাওনা ২৭ শতক ভূমির পুরোটাই বিক্রি করে দিয়ে ভারতে চলে যান। অপর ভাই নারায়ণ চন্দ্র মিত্র গত ২০/২২ বছর পূর্বে বিভিন্ন সময়ে তার পাওনা ২৭ শতক ভূমি থেকে ২২ শতক ভূমি বিক্রি করে দেন। অবশিষ্ট ৫ শতকের ভেতরে বাড়ি করে তিনি বসবাস করছেন। অবিকৃত থাকে তাদের বড় ভাই ব্রজ বিলাস মিত্রের ২৭ শতক ভূমি। ওই ভূমির ভেতরেই থেকে যায় তাদের পিতার নির্মিত মন্দির ও শ্মশান। ১৯৯৮ সালের ৮ মে ব্রজবিলাস মিত্র মারা যান। এরপর তারওয়ারিশ থাকেন তার দুই পুত্র রিপন মিত্র ও সুমন মিত্র। প্রায় ২০ বছর পূর্বে তারা দুই ভাই মিলে ২৭ শতক ভূমি থেকে ৮ শতক ভূমি বিক্রি করেন। এরপর তাদের অবশিষ্ট থাকে ১৯ শতক ভূমি। ২০১০ সালে ওই ১৯ শতক ভূমি ইসলামী ব্যাংক টরকী
বন্দর শাখায় বন্ধক রেখে ২০লক্ষ টাকার ঋণ নিয়ে রিপন মিত্র ও সুমন মিত্র ব্যবসা করছিলেন। ইতোমধ্যে ২০১৭ সালে তাদের মা ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হন। তার চিকিৎসা করাতে গিয়ে ব্যবসার মূলধন খরচের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে আরও অতিরিক্ত ১০ লক্ষ টাকা ঋণ নেন। সুদ আসল মিলে ওই টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ লক্ষ টাকা। এছাড়া মায়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে তারা স্থানীয় বেশ কয়েকটি এনজিও এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণ করেন।
ভাবে ওই ঋণের সুদ আসল মিলে তাদের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি। কোন উপায় না পেয়ে অবশেষে দুই ভাই মিলে তাদের পৈতৃক বাড়িতে থাকা ঘরসহ ওই ১৯ শতক ভূমির ১৪ শতক বিক্রি করে দিয়ে ব্যাংকের ঋণ মুক্ত হন। এখনো এনজিও এবং ব্যক্তির ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করতে পারেননি তারা। এরপর বাড়িতে তাদের দুই ভাইয়ের অবশিষ্ট থাকে ৫ শতক ভূমি। যার মধ্যে ছিল মন্দির ঘর এবং শ্মশান। বসত ঘরসহ ১৪ শতক ভূমি বিক্রি করে আশ্রয়হীন হয়ে পড়া রিপন মিত্র ও সুমন মিত্র। এ অবস্থায় নিজেদের পরিবারের সদস্যদের নিয়েবসবাসের প্রয়োজনে রিপন মিত্র ও সুমন মিত্র সম্প্রতি তাদের মন্দির ঘরটি ভেঙে ফেলে সেখানে নিজেদের বসত ঘর নির্মাণে উদ্যোগী হন। এ কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ানতার আপন চাচা নারায়ণ চন্দ্র মিত্র। তিনি ওই মন্দিরের ভূমিকে তাদের তিন ভাইয়ের যৌথ মালিকানার ভূমি এবং মন্দিরের ভূমি দাবী করে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের কাছে ভুল তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রচার করান যে, রিপন মিত্র ও সুমন মিত্রদীর্ঘদিনের পুরনো মন্দির ভেঙে ফেলেছে। এ ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে। নড়ে চড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসনসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন গৌরনদী উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ডেকে পাঠানো হয় রিপন মিত্র ও সুমন মিত্রকে। তারা ওই সকল
দপ্তরে গিয়ে নিজেদের পারিবারিক ভূমিতে গড়া মন্দিরের কাগজপত্র দেখিয়ে অবৈধভাবে মন্দির ভাঙ্গার অভিযোগ থেকে রক্ষা পান। এতেও ক্ষ্যান্ত হননি তাদের চাচা নারায়ণ চন্দ্র মিত্র। তিনি বরিশাল আদালতে মামলা দিয়ে আদালত কর্তৃক ওই ভূমির উপর ১৪৪ ধারা জারি করিয়েছেন। ফলে আদালতের নির্দেশে আটকে গেছে রিপন মিত্র ও সুমন মিত্রের পরিবারের সদস্যদের সর্বশেষ
আশ্রয়স্থল বসত ঘর নির্মাণের উদ্যোগ। নিরুপায় হয়ে এখন তারা ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভূক্তভোগী ব্যবসায়ী রিপন মিত্র বলেন, আমরা দুই ভাই আমার চাচা নারায়ণ মিত্রের ষড়যন্ত্রের শিকার। তিনি শুধুমাত্র সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, সংবাদমাধ্যম ও আদালতের উপর ভর করে আমাদের হয়রানি করেই ক্ষান্ত । সম্প্রতি তিনি একটি দলিল বের দেখিয়ে আমাদেরকে হয়রানি করছেন। যার দলিল নং ৫৯৬/৮৬ ওই দলিলের দাতা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে আমার পিতা ব্রজ বিলাস মিত্রের নাম এবং গ্রহিতা হিসেবে উল্লেখ করেছে আমার চাচা নারায়ণ মিত্রের নাম। জমির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ১০ শতক। যার দাগ নম্বর ঠিক নেই, দলিলের এক জায়গায় উল্লেখ আছে দাতা দলিল মূলে তার কাছে জমি বিক্রি করেছেন। কিন্তু সেখানে পীঠ দলিলের কোন নাম্বার উল্লেখ নেই। আরেক জায়গায় উল্লেখ আছে দাতার নিজ নামে 77-g(1x-1)75-76 মিউটেশন কেসের মাধ্যমে মালিক হয়ে রেকর্ড মূলে জমি বিক্রি করেছেন। মূলত ওই মিউটেশন কেসটি
আমার দাদার করা মিউটেশন কেস। আমরা আমাদের চাচার এরকম অনৈতিক হয়রানীর হাত থেকে মুক্তি চাই। আমরা প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সকল কর্মকর্তাদের জরুরী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সকল প্রকার হয়রানিরঅবসান চাই। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত নারায়ণ চন্দ্র মিত্র বলেন, আমি মন্দিরটি আমাদের পারিবারিক পুরনো মন্দির এটা বলেছি। ওটি দেবোত্তর সম্পত্তিনয়। রিপন মিত্রের বাবা আমার বড় ভাই ব্রজ বিলাস মিত্রের কাছ থেকে ১০ শতক জমি আমি কিনেছি। যার দলিল, রেকর্ড, কমপ্লিট করা আছে। আমি ওই জমি চাই। মন্দির নিয়ে ওদের সাথে আমার কোন বিরোধ নেই।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ শাহজালাল, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আব্দুল্লাহ্ আল-মামুন,যুগ্ম-সম্পাদক :মো. কামাল উদ্দিন,
নির্বাহী সম্পাদক : রাবেয়া সিরাজী
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ : মোতালেব ম্যানশন, ২ আর কে মিশন রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল : 01796-777753,01711-057321
ই-মেইল : bhorerawajbd@gmail.com