
দিপু দাস—একটি নাম, কিন্তু এই নামের সঙ্গে আজ জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের দায়, সমাজের বিবেক এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতার এক নির্মম বাস্তবতা। একজন মানুষকে হত্যা মানেই শুধু একটি প্রাণহানি নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক গভীর ক্ষত। দিপু দাস হত্যাকাণ্ড সেই ক্ষতকে আবারও নগ্নভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
এই নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংখ্যালঘু ঐক্য মোর্চার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ ছিল কেবল একটি কর্মসূচি নয়—এটি ছিল ন্যায়বিচারের জন্য এক সম্মিলিত আর্তনাদ। প্ল্যাকার্ড, স্লোগান আর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে উচ্চারিত দাবি ছিল একটাই—দিপু দাস হত্যার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বর বরাবরই গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও প্রতিবাদের প্রতীক। সেখানেই আজ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—এই দেশে কি সংখ্যালঘুদের জীবন নিরাপদ? কেন বারবার এমন হত্যাকাণ্ড ঘটছে, আর কেন বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে?
সমাবেশে বাংলাদেশজুড়ে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃত্ববৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি মানবাধিকার ও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বক্তব্য রাখেন হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট চৈতালি চক্রবতী চৈতী। তিনি দিপু দাস হত্যার ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান এবং সংখ্যালঘু নাগরিকদের সাংবিধানিক নিরাপত্তা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা বলেন, দিপু দাস হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক সহিংসতার অংশ, যেখানে সংখ্যালঘু পরিচয় অনেক সময়ই মানুষকে দুর্বল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। কখনো ভূমি দখল, কখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কখনো সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ—কারণ যাই হোক না কেন, ফলাফল একটাই: একটি জীবন শেষ, আর অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম।
সমাবেশে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, তদন্তের গতি ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বক্তারা। তারা বলেন, কেবল আশ্বাস নয়—কার্যকর পদক্ষেপই পারে মানুষের আস্থা ফেরাতে। দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে না পারলে এমন হত্যাকাণ্ড থামবে না।
দিপু দাসের পরিবার আজ শোকের সাগরে ভাসছে। তাদের চোখের জল শুধু ব্যক্তিগত বেদনার নয়; এটি বিচারহীনতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। রাষ্ট্র যদি এই কান্না না শোনে, তবে সেটি হবে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা—যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই মানববন্ধন ও বিক্ষোভ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায়বিচার কোনো দয়া নয়—এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু নয়, এই দেশে প্রতিটি মানুষের জীবন সমান মূল্যবান। দিপু দাস হত্যার বিচার নিশ্চিত করা মানেই কেবল একজনের জন্য ন্যায়বিচার নয়; এটি হবে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধের এক শক্ত বার্তা।
আজ প্রয়োজন রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান, দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ—যেখানে মানুষ নীরব দর্শক না থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
দিপু দাস হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবে যে কণ্ঠগুলো উঠেছে, সেগুলো যেন কেবল সেদিনেই থেমে না যায়। এই কণ্ঠস্বর পৌঁছাক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। কারণ বিচারহীনতার অন্ধকারে আলো জ্বালাতেই আজ এই প্রতিবাদ—ন্যায়ের পক্ষে, মানবতার পক্ষে।