মানুষের সভ্যতা বড়ই বৈপরীত্যে ভরা। যাঁরা এই সভ্যতার আলোকশিখা জ্বালিয়ে রেখেছেন, তাঁরা নিজেরাই থেকে গেছেন অন্ধকারে। যেন সেই বাতিওয়ালা, যে পথে পথে বাতি জ্বালে, অথচ নিজের ঘরে ফেরার পর দেখে নিকষ অন্ধকার। ইতিহাসের পাতায় এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে আলোকিত লেখক, শিল্পী, কবি, নাট্যকার, সুরকার, গীতিকার, কিংবা মুক্তমনের প্রতিভাবান ব্যক্তিরা সময়ের নিষ্ঠুর খেলায় নিগৃহীত হয়েছেন, অবহেলিত হয়েছেন, নিঃশেষ হয়েছেন।
তেমনই এক লেখক বোরিস লিওনিদোভিচ পাস্তারনাক, যিনি জীবনের আলোচনায় যতটা স্মরণীয়, ততটাই স্মরণীয় তাঁর ট্র্যাজেডি। 'ডক্টর জিভাগো'—এই অমর উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৫৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কিন্তু আনন্দের বদলে নেমে আসে বিষাদ। স্বয়ং সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ হুকুম জারি করেন—পাস্তারনাক যদি নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন, তবে তাঁকে দেশ ছাড়তে হবে। কিন্তু দেশপ্রেমিক এই লেখক দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, "আমি দেশ ছেড়ে কখনো কোথাও যাইনি, যাবও না।" তবু নিগৃহীত হওয়ার আশঙ্কায়, শাসকের রক্তচক্ষুর ভয়ে, বাধ্য হয়েই তিনি নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন। এই অভিমান, এই অপমান তাঁর মনোজগতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করল, আর ঠিক দুই বছর পর, দারুণ হতাশা ও মানসিক যন্ত্রণায় মৃত্যুবরণ করলেন তিনি।
তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর পরিবার স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্তি পায়নি। ১৯৮৪ সালে মস্কোর শহরতলীর দাশা থেকে তাঁদের উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়। এমনকি 'ডক্টর জিভাগো' উপন্যাসটি রাশিয়ায় বহুদিন প্রকাশিতই হতে পারেনি।
এক প্রতিভাবান শিল্পীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা- বোরিস লিওনিদোভিচ পাস্তারনাক জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন রাশিয়ান সাম্রাজ্যের মস্কো নগরীতে, এক সমৃদ্ধ ইহুদি পরিবারে। তাঁর পিতা লিওনিদ পাস্তারনাক ছিলেন চিত্রশিল্পী ও স্থপতি, এবং মস্কো স্কুল অব পেইন্টিং-এর অধ্যাপক। মা রোজা কাউফম্যান ছিলেন খ্যাতনামা পিয়ানোবাদক। শৈশব থেকেই তিনি রাশিয়ার বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও শিল্পীদের সংস্পর্শে বড় হন—লেভ টলস্টয়, সের্গেই রাচমানিনভ, আলেকজান্ডার স্ত্রিয়াবিন, রাইনার মারিয়া রিলকের মতো মহৎ মনীষীদের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তিনি।
প্রথমদিকে তাঁর ইচ্ছে ছিল সংগীতশিল্পী হওয়ার, তাই তিনি মস্কো কনজারভেটরিতে ভর্তি হন। কিন্তু পরে দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মারবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯১৪ সালে তিনি রাশিয়ায় ফিরে আসেন এবং সাহিত্যকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। সাহিত্যজীবন ও 'ডক্টর জিভাগো'- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি রাসায়নিক কারখানায় কাজ করেন, যা পরবর্তীতে 'ডক্টর জিভাগো' উপন্যাসের পটভূমি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সোভিয়েত বিপ্লবের পর তাঁর বহু স্বজন দেশত্যাগ করলেও, তিনি দেশেই রয়ে যান এবং নতুন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেন। রাশিয়ায় তিনি কবি হিসেবেই সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত ‘My Sister, Life’ কাব্যগ্রন্থটি বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রুশ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘Second Birth’ (১৯৩২) ও ‘Early Trains’ (১৯৪৩)। কিন্তু বিশ্বব্যাপী তাঁর খ্যাতি আসে ‘ডক্টর জিভাগো’ উপন্যাসের মাধ্যমে। রাশিয়ান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সমাজের বিবর্তনকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাস ১৯৫৭ সালে প্রথম ইতালিতে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৮ সালে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের পর তিনি নোবেল কমিটিকে লিখেছিলেন—
"Immensely thankful, touched, proud, astonished, abashed."
কিন্তু চার দিন পর, সোভিয়েত সরকারের চাপে তিনি লিখতে বাধ্য হলেন—
"Considering the meaning this award has been given in the society to which I belong, I must refuse it. Please do not take offense at my voluntary rejection."
১৯৬০ সালের ৩০ মে, ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
একজন লেখকের করুণ পরিণতি
পাস্তারনাকের জীবন ও সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত শিল্পী বা লেখকের জন্য স্বীকৃতি সবসময় আশীর্বাদ হয়ে আসে না। কখনও কখনও তা হয়ে দাঁড়ায় অভিশাপ। শাসকের চাপে, রাজনৈতিক চক্রান্তে, কিংবা সমাজের গোঁড়ামির শিকার হয়ে শিল্পীকে হারাতে হয় তাঁর স্বপ্ন, তাঁর স্বাধীনতা।
বোরিস পাস্তারনাক শুধু নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে দেননি, তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন—লেখকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার পুরস্কার নয়, বরং তাঁর স্বাধীন চিন্তা ও লেখনী। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে একজন অমর সাহিত্যিক হিসেবে, যিনি নিজের দেশপ্রেমের জন্য, নিজের আদর্শের জন্য নিগৃহীত হয়েছিলেন, তবু আপোস করেননি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ শাহজালাল, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আব্দুল্লাহ্ আল-মামুন,যুগ্ম-সম্পাদক :মো. কামাল উদ্দিন,
নির্বাহী সম্পাদক : রাবেয়া সিরাজী
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ : মোতালেব ম্যানশন, ২ আর কে মিশন রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল : 01796-777753,01711-057321
ই-মেইল : bhorerawajbd@gmail.com