ঠিকাদার-আন্দোলনকারীদের রহস্যজনক সম্পর্ক ও এমডির নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন-
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (KGDCL)-এর সামনে চলমান ‘ঠিকাদারমুক্ত নিয়োগের’ দাবিতে আন্দোলন আসলে কতটা যৌক্তিক? সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—এই আন্দোলন শুধু শ্রমিক অধিকার আদায়ের জন্য নয়, বরং এর নেপথ্যে চলছে কোটি টাকার লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডারবিহীন কাজ বাগিয়ে নেওয়া এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার ষড়যন্ত্র।
ঠিকাদারি পদ্ধতি ও আন্দোলনের অযৌক্তিকতা-
পেট্রোবাংলা ও এর আওতাধীন ১৩টি প্রতিষ্ঠানে গত এক দশক ধরে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে জনবল নিয়োগ চলছে। সরকার অনুমোদিত টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনবল সরবরাহ করে, যারা দৈনিক বা মাসিক মজুরিভিত্তিক কাজ করেন। গ্যাস কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এই কর্মীদের সরাসরি কোনো চুক্তি নেই, বরং তাদের সব দায়-দায়িত্ব ঠিকাদারের ওপর।
এরপরও, কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা কর্মীরা ‘স্থায়ী নিয়োগের’ দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন, যা বাস্তবে অযৌক্তিক ও আইনবহির্ভূত। কেননা, সরকারের বিদ্যমান নিয়োগ কাঠামোতে এই কর্মীদের স্থায়ী করার কোনো বিধান নেই। তাহলে কীসের ভিত্তিতে এই আন্দোলন? শাওন এন্টারপ্রাইজ: আউটসোর্সিং-এর আড়ালে বাণিজ্য-চট্টগ্রামে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির জন্য বিগত ১০ বছর ধরে ‘শাওন এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জনবল সরবরাহ করে আসছে। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক দেলোয়ার হোসেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি রাজনৈতিক সুবিধাভোগী—একসময় ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, আর এখন বিএনপি-জামায়াতের ছত্রচ্ছায়ায় নিজেকে খালেদা জিয়ার প্রতিবেশী হিসেবে উপস্থাপন করছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, এক বছরের চুক্তি শেষে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়। কিন্তু দেলোয়ার হোসেন কোনো টেন্ডার ছাড়াই বছরের পর বছর ঠিকাদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন, যা পুরোপুরি অবৈধ। এই প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে, অথচ কর্তৃপক্ষ রহস্যজনকভাবে নিরব।
নিয়োগ বাণিজ্যে ১০ কোটি টাকার কারসাজি-
চসবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, শাওন এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে কর্মরত শ্রমিকদের স্থায়ী চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিজনের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। প্রায় ২০০ জনের কাছ থেকে তোলা হয়েছে অন্তত ১০ কোটি টাকা! এই টাকা ‘বৈধ’ করার জন্যই বর্তমান আন্দোলন—যেন তারা গ্যাস কোম্পানির স্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগ পান এবং নেওয়া টাকা হজম করা যায়। অথচ, সরকার বা কোম্পানির সঙ্গে তাদের কোনো সরাসরি নিয়োগ চুক্তি নেই।গ্যাস কোম্পানির এমডির নিরবতা: রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে- এত বড় অনিয়ম চলতে থাকার পরও কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রহস্যজনকভাবে নিরব।
প্রশ্ন উঠছে— কেন টেন্ডার ছাড়াই একই ঠিকাদার বছরের পর বছর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে? কেন এই নিয়োগ-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? কেন আন্দোলনকারীদের অযৌক্তিক দাবিকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে? সরকার ও কোম্পানির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের পাঁয়তারা-
এই আন্দোলনের কারণে পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালানো হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ মনে করে সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার দিচ্ছে না। অথচ বাস্তবে, এই আন্দোলনের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্যকে জায়েজ করা।
নিষ্পত্তির উপায় ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা-
১. দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া চালু করা: অবৈধভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া ঠিকাদারকে বাদ দিয়ে নতুনভাবে টেন্ডার আহ্বান করা হোক। ২. নিয়োগ-বাণিজ্যের তদন্ত: ১০ কোটি টাকার নিয়োগ-বাণিজ্যের তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. আউটসোর্সিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা: ভবিষ্যতে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে গ্যাস কোম্পানির আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় আরও স্বচ্ছতা আনতে হবে। ৪. শ্রম আইন অনুযায়ী সমাধান: আন্দোলনকারীদের বুঝতে হবে, তাদের দাবি যদি আইনসঙ্গত না হয়, তাহলে আন্দোলন করে কিছুই আদায় করা যাবে না।
এই আন্দোলন শ্রমিক অধিকার রক্ষার জন্য নয়, বরং কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের অবৈধ নিয়োগ-বাণিজ্য রক্ষা
করতে এই নাটক সাজিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এবং গ্যাস কোম্পানির কর্তৃপক্ষ কবে এই চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে সঠিক ব্যবস্থা নেয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ শাহজালাল, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আব্দুল্লাহ্ আল-মামুন,যুগ্ম-সম্পাদক :মো. কামাল উদ্দিন,
নির্বাহী সম্পাদক : রাবেয়া সিরাজী
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ : মোতালেব ম্যানশন, ২ আর কে মিশন রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল : 01796-777753,01711-057321
ই-মেইল : bhorerawajbd@gmail.com